কালো ডিম - পর্ব ০১ (গল্প-সল্প)


বাবার ট্রান্সফার হওয়ার প্রাথমিক চিঠি আমাদের হাতে এসে পৌঁছিয়েছে। মাস দু'একের মধ্যে বাবার চাকরির ট্রান্সফরমেশনের সুবাদে আমরা সপরিবারে মেহেরপুর চলে যাবো। এই অভিজ্ঞতা আমাদের নতুন নয়। তিন বছর আগে দিনাজপুর থেকে খাগড়াছড়ির এই এলাকায় আমরা সপরিবারে এসেছিলাম। বাবা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের একজন সিনিয়র ইন্সপেক্টর। এখানকার যে বাসাটায় আমরা ভাড়া থাকি সেটা একেবারে খারাপ বললে অন্যায় হবে। হিমেল ভিলা। বেশ বড়ো-সড়ো রুম। তবে বেশ পুরনো। দোতলায় থাকি আমরা। বিল্ডিংটা দোতলারই। এলাকাটা বেশ নির্জন। নিচতলায় আগে বাড়িওয়ালারা থাকতো। গত বছর তাদের একমাত্র ছেলে হিমেল এর আত্মহত্যার পর, বাড়িওয়ালা আঙ্কেল আর আন্টি তাদের গ্রামের বাড়িতে চলে যান। মাঝে মাঝে বাবার সাথে ফোনালাপ হতে শুনেছি। ভাড়ার ব্যাপারে আঙ্কেলের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। তবে বাবা কখনোই ভাড়া বাকি রাখেন না। হিমেল আমার বয়সে ছোট ছিলো। তবে ওর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা অনেকটা বন্ধুর মতোই ছিলো। হিমেল বেশ রোগা-পাতলা ছিল। চুলে আর্মি কাট। মোটা কাঁচের চশমা পরতো। আমাদের বাসার পিছন দিকে খানিকটা দূরে একটা কোচিং সেন্টার আছে। আমি আর হিমেল ঐ কোচিং সেন্টারেই পড়তাম। খুব বেশি শিক্ষার্থী ছিলো না সেখানে। আমরা প্রতিদিন বিকালে একসাথেই কোচিংয়ে যেতাম। ওর কাঁধে স্পাইডারম্যানের একটা ব্যাগ থাকতো। বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা পেরিয়ে যেতো। মোটামুটি সোয়া সাতটা বেজে যেতো। হিমেলের আত্মহত্যার পর থেকে সেখানে কোচিং করা ছেড়ে দিয়েছি। হুট করে কেন যে আত্মহত্যা করলো ছেলেটা বুঝলাম না। অনেক কেঁদেছিলাম ওর জন্য। হিমেলের আত্মহত্যার তদন্ত আমার বাবাই করেছিলো। কিন্তু হঠাৎ করে কেন যেন কেসটা ক্লোজ হয়ে গেলো বুঝলাম না। অনেকবার বাবাকে জিজ্ঞেসও করেছি। প্রতিবারই বাবা এড়িয়ে গেছেন। আজও জানতে পারিনি কেন হিমেল পৃথিবীর মায়া নিজ হাতে খুন করেছিলো। হিমেল আত্মহত্যা করেছিলো বলে ঠিকমতো গোসলও দেয়া হয়নি তাকে। কোনোরকম কয়েক বালতি পানি ঢেলে, জানাজা দেওয়া হয়। সেদিন রাতে প্রচন্ড বৃষ্টি ছিলো বলে তাকে কোনোরকম পুঁতে রাখা হয় বাসার সামনের বটগাছটার পাশে। আত্মহত্যা জেনে কেউই জানাজা পড়তে তেমন আগ্রহ দেখাননি। বটগাছটাকে আমাদের বাসার বারান্দা থেকে বেশ স্পষ্টই দেখা যায়। বটগাছটার সাথেই পাকা একটা রোড রামগড়ের দিকে গেছে। হিমেলের কবর এখানে দেওয়ার পর থেকে এই এলাকায় তেমন কেউ আসে না। দিনের বেলা দুই একজন মানুষ আর কয়েকটা রিকশা চললেও, রাতের বেলা একেবারেই জনশূন্য এই এলাকা। সন্ধ্যাবেলায় মাঝেমধ্যে দুই একটা যানচলাচল চোখে পড়ে। বটগাছ থেকে খানিকটা দূরে রোডের উপর একটা সৌরচালিত ল্যাম্পপোস্ট আছে। রাত হলে সেটা নিজেই জ্বলে উঠে। হিমেলের কবর এখানে দেওয়ার পর থেকে আশেপাশের লোকজন এই বটগাছ নিয়ে যে কত বানোয়াট ভুতুড়ে কাহিনি বলেছে, সেগুলো শুনে যে কত হেসেছি হিসেব নেই। যদিও আম্মু এগুলো নিয়ে হরহামেশাই দুশ্চিন্তায় থাকেন। আমি বিজ্ঞানের ছাত্র, তাই এসব বাজে জিনিসে আমার বিশ্বাসের প্রশ্নই ওঠে না। সন্ধ্যাবেলায় বটগাছের ঐদিকে দখিণা বাতাস বয়। একেবারে হৃদয়ছোঁয়া সেই বাতাস। তাই প্রতি সন্ধ্যায় এই বটতলে বসাটা আমার দৈনন্দিন কার্যসূচীর একটি। যদিও আমার এই আচরনে আম্মুর কাছে হরহামেশাই বকা খাই। তবে বাবা তেমন কিছুই বলেন না। প্রতিদিনের মতো সন্ধ্যাবেলায় বটতলে বসে আছি। হঠাৎ এই নির্জন রাস্তায় একটা ছেলেকে দেখে বেশ হতভম্ব হলাম। হাত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সময় তখন সোয়া সাতটা। ছেলেটা বেশ রোগা-পাতলা। চুলে আর্মি কাট। চোখে মোটা কাঁচের চশমা। কাঁধে স্পাইডারম্যানের একটা ব্যাগ। একদম চুপচাপ হেটে যাচ্ছে রামগড়ের রোড ধরে। দেখেই আন্দাজ করে ফেললাম পাশের কোচিং সেন্টার থেকে বাড়ি ফিরছে। বটগাছ থেকে ল্যাম্পপোস্টটা খানিকটা দূরে থাকায় ঠিকমতো মুখটা দেখতে পারিনি। কেন জানি মনে একটা সুপ্ত ভয় নিয়ে বেশ তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসলাম। রাতের খাবার না খেয়েই শুয়ে পড়লাম। আম্মু দেখেও না দেখার ভান করলো। বাবা তখনো বাসায় ফিরেনি। পরদিন সকালে কিসের যেন খটর খটর আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেলো। কোনোরকম চোখ মুছতে মুছতে উঠে দেখি আম্মু বাসার রেফ্রিজারেটরটা নিয়ে কি জানি করছে। কি হয়েছে, তা জানার আগ্রহ না দেখিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতেই আম্মু বলে উঠল, ''রেফ্রিজারেটরটা খানিকক্ষণ চলে আবার চলে না, বেশ পুরনো হয়ে গেছে''। কিছুই বললাম না। এই সময়ে বাবা কখনোই নতুন রেফ্রিজারেটর কিনবেন না, কারণ কিছু দিনের মধ্যেই আমরা মেহেরপুর চলে যাবো। নাস্তা সেরে কলেজে চলে গেলাম। সেদিন সন্ধ্যায় রোজকার মতো বটতলে বসে ছিলাম। কালকের ছেলেটাকে আবারও একই রূপে দেখতে পেলাম। কালকে ভালোমতো খেয়াল করিনি। আজ ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম, ছেলেটির হাতে কালো রঙের ডিমের মতো দেখতে কিছু একটা। আবার ছেলেটার মাথাও রহস্যজনকভাবে কিছুটা দুলছে। তবে ছেলেটা চুপচাপ, কোনোদিকে না তাকিয়েই হেঁটে যাচ্ছে। কৌতুহলবশত ছেলেটাকে ডাক দিলাম। কিন্তু ছেলেটা কর্ণপাতই করলো না। আরও উঁচু গলায় ডাকতে লাগলাম এবার। কিন্তু ছেলেটা একটি বারের জন্য ফিরেও তাকালো না। চার-পাঁচ দিন আমার সাথে ছেলেটির একই ঘটনা ঘটলো। এই চিন্তা মনে বেশ বাসা বেঁধেছিলো যে, এই ছেলেকে এতো জোরে ডাকা সত্ত্বেও আমাকে পাত্তা দেয় না কেন? পরে ভাবলাম ছেলেটি হয়তো বধির, কানে শুনতে পায় না অথবা বোবা। কিন্তু সেদিন ছেলেটা হঠাৎ আমার দিকে রহস্যজনকভাবে তাকালো। আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। ছেলেটির চেহারায় হিমেলের প্রতিকৃতি খুঁজে পেলাম। আমি নিশ্চুপ হয়ে গেলাম। ছেলেটা আবার নিজের মতো করে হাঁটতে লাগলো। আমি বাসায় ফিরে গেলাম। রুমের দরজা আঁটকে, রুমের এক কোণে বসে হাঁটু উঁচু করে, কপাল হাঁটুতে ঠেকিয়ে বসে পড়লাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম? সকালে উঠে নাস্তা সেরে মনে পড়লো আজ শুক্রবার। কলেজ নেই। মনে একটা সুপ্ত আনন্দ খুঁজে পেলাম। তবে সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হঠাৎ আম্মু এসে বাজারের থলি ধরিয়ে দিয়ে বলল,''রামগড় থেকে বাজার করে আনতে হবে, খাসির মাংস কিনতে হবে''। রামগড় এখান থেকে বেশী দূরে না। রামগড়ে বিশাল হাট বসে। হাঁটতে হাঁটতেই পৌঁছে গেলাম রামগড়। বিশাল হাট বসেছে। খাসির মাংসের দোকানের দিকে যেতেই হঠাৎ একটা মুদি দোকানে নজর পড়ল। দেখলাম কাল রাতের সেই ছেলেটা ডিম কিনছে। ডিম ব্যাগে ঢুকিয়ে বলল,''দাম কত হয়েছে? আমি শুনে চমকে উঠলাম। তারপর দোকানদার বলল,''পয়ত্রিশ টাকা''। ছেলেটা পঞ্চাশ টাকার নোট দিয়ে পনেরো টাকা ফিরত নিয়ে, খাসির মাংসের দোকানের ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেলো। আমি আর খুঁজেও পেলাম না। তার মানে ছেলেটি বোবাও নয়, বধিরও নয়। এগিয়ে গিয়ে দোকানীকে জিজ্ঞেস করলাম ছেলেটার ব্যাপারে। জানতে পারলাম স্থানীয় খাসির মাংসের ব্যবসায়ী জয়নাল মিয়ার ছেলে সে। ওর নাম বিকাশ। সেদিন খাসির মাংস কিনে বাড়ি ফিরে গেলাম। সন্ধ্যায় প্রতিদিনের মতো বটতলে বসে ছিলাম। আবার ছেলেটিকে দেখতে পেলাম। প্রতিদিনের মতো ওর হাতে কালো রঙের ডিম। অদ্ভুতভাবে মাথা দোলাচ্ছে। ভয়ে ভয়ে আজকে সরাসরি নাম ধরে ডাকলাম। বিকাশ, বিকাশ......। ছেলেটি একটি বারের জন্য ঘুরেও তাকালো না। নিজের মতো করে হেঁটে চলে যেতে লাগলো। আমার সাহস হয়নি তার সামনে গিয়ে পথ আঁটকিয়ে দাঁড়ানোর। একটু দূরে যাওয়ার পর দেখতে পেলাম, ছেলেটির পেছনে কিছু কুকুর ডাকছে। কুকুরগুলোর ডাক শুনে দূরে থেকেও আমি ভয় পাচ্ছিলাম। কিন্তু ছেলেটি কুকুরগুলোর দিকে একবার ফিরেও তাকালো না। ছেলেটি যদি বধির না'ই হয়ে থাকে তবে সন্ধ্যাবেলায় বিকাশের কি এমন হয় যে সে, কোনো কিছুই শুনতে পায় না। মনে মনে এই ভয়ানক রহস্যজনক প্রশ্ন নিয়ে বাসায় ফিরে গেলাম। সর্বক্ষণ মাথায় এ প্রশ্ন রয়েই গেলো। পরদিন সন্ধ্যায় আবার বটতলায় বসলাম। সেই একই কাহিনী। প্রতিদিনের মতো ওর হাতে কালো রঙের ডিম। অদ্ভুতভাবে মাথা দোলাচ্ছে। আজকে আর ডাকলাম না। ভাবলাম ওর মাথায় সমস্যা আছে হয়তো। কিন্তু মনে একটা সুপ্ত প্রশ্ন রয়েই গেলো যে, কেনো এই নির্জন স্থানে বিকাশ এমন আচরণ করে? তবে কি এলাকার লোকজন হিমেলের কবর নিয়ে যে ভৌতিক কাহিনীগুলো বলেছে সেগুলো আসলেই সত্যি? আমি বিজ্ঞানের ছাত্র। এত সহজেই এসব ব্যাপারে বিশ্বাস আমি করতে পারি না। হঠাৎ দেখলাম একটা ট্যাক্সি বিকাশকে হর্ণ দিতে দিতে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিকাশ শুনছেই না। এমন সময় হঠাৎ বিপরীত দিক থেকে একটা মোটরসাইকেল চলে আসলো।  ট্যাক্সিওয়ালা বিকাশকে বাঁচাতে গিয়ে মোটরসাইকেলের সাথে সংঘর্ষ করে বসে। সংঘর্ষটা বিকাশের একটু পিছনেই হয়। মোটরসাইকেল ছিটকে একদিকে চলে যায়, মোটরসাইকেল চালক রাস্তার উপরই গড়াগড়ি খাচ্ছিলো। রক্তে রাস্তা অনেকদূর ভিজে গেলো। ট্যাক্সি ড্রাইভার অজ্ঞান। এতকিছু হয়ে যাওয়ার পরও বিকাশ একবারও পেছন দিকে ঘুরেও তাকালো না। সে এমনভাবে হাঁটছিলো, মনে হয় যেন কিছুই হয় নি। আওয়াজ শুনে বাসা থেকে বাবাকে ছুটে আসতে দেখলাম। নিজের চোখের সামনে প্রথম কোনো দূর্ঘটনা আর বিকাশের এমন ভৌতিক আচরণ দেখে সবকিছুকে গুলিয়ে ফেললাম। জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে দেখতে পেলাম আমার রুমে। পাশে বাবা বসা ছিলো। আমাকে বললো,'' ট্যাক্সি আর মোটরসাইকেল চালক দুজনেই এখন সুস্থ আছেন''। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। সেদিনের পর থেকে চার-পাঁচ দিন আর সন্ধ্যায় বটতলায় যাইনি। কলেজেও যাইনি। সারাদিন রুমেই বসে ছিলাম। একটা সুপ্ত ভয় মনে বিরাজমান ছিল। একদিন সকালবেলা হাঁটতে হাঁটতে ঐ কোচিং সেন্টারটার দিকে গেলাম। কোচিং সেন্টারের সামনের রাস্তায় মাসুদ স্যারের সাথে দেখা হলো। তিনি ছিলেন বিজ্ঞানের শিক্ষক। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। আমি সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় সেরে নিলাম। স্যার খুব ভালো করেই জানেন, কেন এখন আর আমি এই কোচিং সেন্টারে পড়ি না। তাই জিজ্ঞেসও করেন নি। তারপর আমি স্যারকে বিকাশের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। জানতে পারলাম বিকাশ এবার এস.এস.সি পরীক্ষার্থী। বেশ ভালো ছাত্র। রামগড়ে ভালো কোচিং সেন্টার না থাকায় এই এলাকায় এসে কোচিং করে সে। স্যারের সাথে বিকাশের সম্পর্কটা নাকি বন্ধুসুলভ। স্যারের কাছ থেকে আরও জানতে পারলাম, বিকাশ নাকি খুবই মনোযোগী একজন ছাত্র। ক্লাসে সবসময় পড়া বলতে পারে। বিজ্ঞান নিয়ে নাকি তার বেশ আগ্রহ। তারপর স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম, ''বিকাশ কি কানে শুনতে পায় না?'' স্যার ভ্রু কুঁচকে বলল, '' কেন কানে শুনবে না? অবশ্যই শুনতে পায়।'' তিনি আরও জানান,'' বিকাশ যেদিন প্রথম এই কোচিং সেন্টারে এসেছিলো সেদিনই তো বিকাশ আমাকে বলল তার শখ গান শোনা। তাছাড়া ক্লাসেও সে বেশ মনযোগী। সুতরাং বিকাশের বধির হওয়ার প্রশ্নই আসে না।'' স্যারের কথাগুলো শুনে বেশ অবাক হলাম। তারপর আবার জিজ্ঞেস করলাম,''বিকাশ কি তাহলে বোবা?'' স্যার মুচকি হেসে বলল,''বিকাশের গানের গলাও বেশ ভালো। সুতরাং বোবা হওয়ারও প্রশ্ন আসে না''। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে গেলাম। স্যার হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো,''কেন, কি হয়েছে?'' বললাম, ''তেমন কিছুই না, স্যার।'' এমন সময় একটা রিকশা চলে আসায় স্যার রিকশায় চড়ে বাসায় চলে গেলেন। সেখান থেকে বাড়ি ফিরে সারাদিন বিষয়টা নিয়ে ভাবতে লাগলাম। কোচিং সেন্টারে থাকাকালীন যে ছেলে সব কিছু শুনতে পারে–বলতে পারে, বাড়ি ফেরার সময় বটতলায় কি এমন হয় যে ছেলেটা কিছুই শুনতে পায় না। আস্তে আস্তে মনে হতে লাগলো, আমিও ভূতে বিশ্বাস করি। কিছু সময়ের জন্য আবার নিজেকে শুধরে নিলাম। হঠাৎ বুক শেলফের একটা বইয়ের দিকে নজর পড়ল।  বইয়ের নাম 'ভূত বনাম বাস্তবতা'। বইটা আগে কোনোদিন পড়িনি। পড়ার আগ্রহও জাগে নি। কেননা যে ছেলে ভূতে বিশ্বাসী নয়, সেই ছেলে কেনো ভূতের বই পড়বে? তবে আজ না চাইতেও বইটা হাতে নিলাম। বইটা খুলে পড়তে লাগলাম। বেশ খানিকক্ষণ পড়ে বইটা পাশে অবহেলিতভাবে ফেলে রাখলাম। পড়ায় মন বসেছিলো না। তবে যেটুকু পড়েছি তা থেকে জানতে পারলাম, আমরা অনেক সময়ই পরিবেশ অনুযায়ী মৃদু ভয় অনুভব করি। নির্জনতা আমাদের চোখে অনেক কিছু দৃশ্যমান করায়। সবই আমাদের চোখের ভ্রম। আবার অনেক পুরোনো স্মৃতি কাকতালীয়ভাবে মিলে যেতে পারে। আমাদের আশেপাশের দৃশ্যমান রহস্যগুলোর পিছনে কোনো না কোনো যুক্তি ঠিকই আছে। হয়তো তা সবসময় প্রত্যক্ষ হয় না। এ কথাগুলো পড়ার পর মনে কিছুটা সাহস খুঁজে পেলাম। বারান্দায় গিয়ে বসে পড়লাম। যেখান থেকে বটগাছটা বেশ স্পষ্ট দেখা যায়। তারপর বসে বসে ভাবতে লাগলাম, বিকাশের অধিকাংশ বৈশিষ্ট্য হিমেলের সাথে মিলে যাওয়াটা কাকতালীয় হতে পারে। তাছাড়া বিকাশের চেহারায় হিমেলের প্রতিকৃতি খুঁজে পাওয়াটা হয়তো আবছা আলোয় আমার চোখের ভ্রম হতে পারে। কিন্তু কিছুতেই বিকাশের কানে না শোনার ব্যাপারটা হজম হচ্ছিলো না। এসব ভাবতে ভাবতে বিকেল হয়ে গেলো। হঠাৎ বটতলার দিকে তাকিয়ে দেখলাম বিকাশ আসছে। দেখেই বুঝে গেলাম কোচিংয়ে যাচ্ছে। সবসময়ের মতো হাতে কালো একটা ডিম, অদ্ভুতভাবে মাথা দোলাচ্ছে। ডাক দিবো ভাবলাম। এমন সময় আম্মু ডেকে বলল বাসার রেফ্রিজারেটরটা নাকি একেবারেই চলছে না। মেকানিক আনতে রামগড় যেতে হবে। বাবা এসব করার সময় পায় না। তাই এসব কাজ আমাকেই করতে হয়। আম্মুর কথা শুনে, বটতলার দিকে তাকাতেই দেখি, বিকাশ নেই। হঠাৎ যেন অদৃশ্য হয়ে গেলো। রামগড়ের দিকে রওনা হলাম। মেকানিক আনতে হবে। মেকানিক আনতে আনতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। মেকানিকসহ বাসায় এসে দেখি বিদ্যুৎ নেই। সাধারণত এই এলাকায় তেমন লোডশেডিং হয় না। দূর্ভাগ্যবশত আজকেই সেই লোডশেডিং। মেকানিক বিদ্যুৎ ছাড়া কোনো কাজই করতে পারবেন না। মেকানিক কিছুক্ষণ বসে চা-পানি খেয়ে বিদ্যুতের জন্য অপেক্ষা করে, সবশেষে নিরাশ হয়ে চলে গেলেন। মেকানিককে বিদায় দিয়ে দেয়াল ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি সময় তখন সাড়ে আট টা। অর্থাৎ বিকাশ বাসায় চলে গিয়েছে। তাই আর বটতলায় না গিয়ে বাসায় বসে মোমের আলোয় ফেলে রাখা সেই বইটা পড়তে লাগলাম।  পড়তে পড়তে কখন যে টেবিলের উপর ঘুমিয়ে গেলাম টেরই পেলাম না। সকালে উঠে দেখি মোম ফুরিয়ে গেছে। বইয়ের এক কোণায় বেশখানেক অংশ পুঁড়ে গেছে। দেখে বোঝাই যাচ্ছে অসতর্কতাবশত মোমে বই লেগে এমনটি হয়েছে। তবে সৌভাগ্যবশত বড় কোনো দূর্ঘটনা ঘটেনি। হঠাৎ আম্মু আমাকে ডাক দিলো। পাশের রুমে গেলাম। গিয়ে দেখলাম রেফ্রিজারেটরে থাকা খাসির মাংসগুলোর বরফ গলতে শুরু করেছে। এমনিতেই রেফ্রিজারেটর নষ্ট, তার উপর আবার কাল রাত থেকে লোডশেডিং।  এখনও বিদ্যুৎ আসেনি। আমি তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে কলেজে চলে গেলাম। কলেজ থেকে বাসায় ফিরে দেখি এখনো লোডশেডিং চলছে। হাত মুখ ধুতে ধুতেই মাগরিবের আজান দিয়ে দিলো। নামাজ পড়ে একটা মোম জ্বালালাম। কিছুদিন পর শীত আসতে চলেছে। গরমের রেশ এখনো কাটে নি। বাসায় প্রচন্ড গরম। ঠিকমতো আলোও নেই। তাই বাধ্য হয়ে বেশ তাড়াতাড়ি করেই বটতলার হাওয়া খেতে চলে গেলাম। মনে মনে একটা ভয় নিয়ে সোয়া সাতটার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টটা সৌরচালিত হওয়ায় ঠিকই চলছিলো। সোয়া সাতটা বেজে গেলো। কারো যেন পায়ের আওয়াজ শুনতে পেলাম। হ্যাঁ, বিকাশ আসছে। তবে আজকে বিকাশের হাতে কালো ডিমটা নেই। মাথাও দোলাচ্ছে না। মনে সাহস নিয়ে ডাক দিলাম। বিকাশ....। আশ্চর্যজনকভাবে আজ এক ডাকেই সাড়া দিলো বিকাশ। আমার দিকে তাকিয়ে, আমার কাছে আসলো। কাছে এসে বললো,''জি, ভাইয়া''। আমি শুনে চমকে উঠলাম।  কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। মনোযোগ ফিরিয়ে এনে জিজ্ঞেস করলাম,''তোমার হাতের কালো ডিম টা আজ কোথায়?'' ভ্রু কুঁচকে বিকাশ উত্তর দিলো,''কালো ডিম? কিসের কালো ডিম?'' আমি উঁচু গলায় বললাম, ''কালো ডিম চিনতে পারছো না তুমি? যে কালো ডিমটা প্রতিদিন কোচিংয়ে যাওয়ার সময় তোমার হাতে থাকে সেটা, যেটা হাতে রেখে তুমি অদ্ভুতভাবে মাথা দোলাও সেটা। কতদিন যে তোমাকে পেছন থেকে ডেকেছি হিসেব নেই। তুমি তো আমাকে পাত্তাই দাও না। আজ কোথায় তোমার সেই কালো ডিম? তোমাকে জবাব দিতেই হবে।'' আমার কথা শুনে বিকাশ অদ্ভুতভাবে হাসতে শুরু করলো। বিকাশের হাসি দেখে আমি বেশ রাগান্বিত হলাম। হাসি থামিয়ে বিকাশ বলল, ''আসলে ভাইয়া, কাল সন্ধ্যা থেকেই লোডশেডিং চলছে। তাই আমার ওয়্যারলেস ইয়ারফোনটাতেও চার্জ নেই। ইয়ারফোনটা ইতালি থেকে আমার কাকা পাঠিয়েছে।গান শোনা আমার শখ। কিন্তু চার্জ না থাকায় ডিমের মতো দেখতে চার্জিং কেইস সহ ইয়ারফোন বাসায় রেখে এসেছি''। আসল কাহিনীটা বুঝতে পেরে মনে মনে বেশ লজ্জিত হলাম। হাসিও আসছিলো অনেক। হঠাৎ আম্মু বারান্দা থেকে আমাকে ডাক দিলো। বারান্দার বাতিটা জ্বলতে দেখে বুঝলাম, বিদ্যুৎ এসেছে। মা উঁচু গলায় বলে উঠল, ''রেফ্রিজারেটরটা ঠিক হয়ে গেছে। সেটা এখন ঠিকঠাকমতো চলছে।'' মাথা ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখলাম বিকাশ ততক্ষণে বেশ অনেকদূর হেঁটে চলে গেছে।            

Comments

Popular posts from this blog

আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে আনার ১০১ টি উপায়

কালো শাড়ি - পর্ব ০৩(গল্প-সল্প)