বাঙ্গালির ভোজন রসিকতা - ইফফাত হাছান অমি
বাঙালি জাতি স্বভাবতই ভোজন রসিক। খাবার সময় পাতে হরেক রকমের পদ না থাকলে বাঙালির ঠিক জমে না। বাঙালির এই ভোজন রসিকতা বাঙালিকে বিশ্ব দরবারে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। ভালো! ব্যাপারটা ভালো! বেঁচে থাকার জন্য অবশ্যই খাবার প্রয়োজন। তা না হলে রাসায়নিক শক্তি আমরা পাবো কোত্থেকে? পেটে কিছু না পড়লে ঘিলুতেই বা আসবে কি করে? তবে রসিকতা ও বিলাসিতা এই দুটো শব্দকে যারা জগা-খিচুড়ি বানিয়ে ফেলেছে, সচেতনমহলের কথাগুলো তাদেরকে উদ্দেশ্য করে প্রদান করাটাই যৌক্তিক। একজন বাঙালির জীবনে চোখে পড়ার মতো ভোজন বিলাসিতার কিছু বিষয়াদিঃ
বাসায় মেহমান আসাঃ
আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করা বেশ সুশীল একটি কাজ। তাছাড়া বাঙালি অতিথি-আপ্যায়নেও বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। কয়েকটা ভিন্ন ভিন্ন সংসার,পরিবার একত্রিত হচ্ছে-গল্পগুজব করছে, পৃথিবীর মধুমাখা উল্লেখযোগ্য কয়েকটা দৃশ্যের তালিকায় এই দৃশ্যটি বেশ ভালোভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে টিকে থাকার কথা। ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি বাসায় বিশেষ কোনো মেহমান আসার আগেই পুরুষসমাজ ব্যস্ত হয়ে পড়তো মুদি-মাল কেনাকাটায়, পক্ষান্তরে নারীসমাজ ব্যতিব্যাস্ত হয়ে পড়তো রান্নাঘরের গারদখানায়। দশক দশক আইটেম! আত্মীয়কে আপ্যায়ন করতে হবে। ভাবটা এমন যেন, আত্মীয় বাসায় আসার মূল উদ্দেশ্য হলো পেটের পূজা করানো। কখন যে মেহমানকে গলা-অবধি গেলাবে সবার ওই একই চিন্তা। কিছু কিছু মেহমান তো এমনও আছেন যে, ''খাওয়া-দাওয়া শেষ, সোনার বাংলাদেশ। বিদায় বাপু।'' আবার যারা একটু বুদ্ধিমান তারা মনে মনে বলেন, '' মাত্র তো খাওয়া হলো, একটু বসি। নাইলে আবার গেরস্থ নিন্দে করবে যে, খেয়েই চলে গেলো?'' মোটকথা অতিথি আপ্যায়ন মানেই পেটপুরে গলা অবধি ঢুকানো। মা-চাচিরা যে রান্নাঘরের শেকল ভেঙে অতিথির সাথে এসে একটু কুশলাদি বিনিময় করবে সেই অবকাশটুকুও অনেক সময় হয়ে ওঠে না। শেষ সময়ে হয়তো এসে বলে, ''আপনাকে কষ্ট দিলাম, ক্ষমা চাই।''
কোথাও ঘুরতে যাওয়াঃ
আত্ম-উন্নয়নে গা ভাসানো ভালো। তাই বলে বিনোদনের জন্য বিশেষ সময়ের ব্যাপারে গাফিলতি দেখানোও ঠিক নয়। বাংলাদেশের মানুষ সাধারণত অবকাশযাপনে ভ্রমনকালে দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোকেই সর্বাধিক পছন্দের তালিকায় রাখে। যেমনঃ কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, সাজেক ভ্যালি ইত্যাদি ইত্যাদি। বাঙালির এই ভোজন রসিকতার ফায়দা লুটতে এসব পর্যটনকেন্দ্রগুলোর চিপায়-চাপায় অসংখ্য বিলাসবহুল রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে। কোথাও ভ্রমণে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাঙালিদের উল্লেখযোগ্য আলোচ্য বিষয় থাকে, সেখানে গিয়ে যদি ভালো একটা রেস্তোরাঁয় পেটের পুজা না করাতে পারি তাহলে তো ট্যুরটাই বৃথা। আমরা সমুদ্র উপভোগ করার চেয়েও নিজেদের ভোজন বিলাসিতাটাকে অনেক ক্ষেত্রেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলি। আমার আজ পর্যন্ত সমুদ্র দেখার সৌভাগ্য হয়নি। কখনো যদি তা হয় তবে সমুদ্র সৈকতে বালির উপর শুয়ে অথবা সেখানে একটা কাপড় বিছিয়ে প্রাচীন নবাবদের মতো ঠ্যাং উঁচিয়ে বসবো। আর সমুদ্র দেখবো। প্রতিটা ঢেউয়ের হিসেব করবো। এই মধুর দৃশ্য দর্শন করে মনকে প্রশান্ত করার চেষ্টায় নিযুক্ত হবো৷ খানিক পর পর গলা ভেজানোর জন্য সাথে হয়তো একটা লেবু বা কমলার জ্যুস রাখা যেতে পারে।
ভোগ-বিলাসিতা হিসেবে ভোজনঃ
'ভোগ' মানেই শুধু ভোজন নয়। ভোজন, 'ভোগ-বিলাসিতা'র একটা অংশমাত্র। পাঁচ তলায় উঠার জন্য যদি লিফট ব্যবহার করেন তবে এটাও প্রাথমিক পর্যায়ের একটা 'ভোগ-বিলাসিতা'। যে পথ চাইলেই একটু কষ্ট করে হেঁটে পার করে দশ টাকার রিকশা ভাড়া বাঁচানো যায়, সে পথও যদি রিকশায় চড়ে যান তবে এটাও প্রাথমিক পর্যায়ের একটা 'ভোগ-বিলাসিতা'। বাজারে গিয়ে ৩০ টাকার জিনিস ২০ টাকায় দরাদরি করতে যদি আপনার আত্মসম্মানে লাগে তবে সেটাও প্রাথমিক পর্যায়ের একটা 'ভোগ বিলাসিতা'। আর সকল প্রাথমিক পর্যায়ের ভোগ বিলাসিতাই একেকটা প্রাথমিক পর্যায়ের 'পাপ'। আর আমরা প্রাথমিক পর্যায়ের 'পাপী'। আর আমি নিজেও প্রাথমিক পর্যায়ের একজন পাপী। কেননা উপরের সবগুলো উদাহরণই আমার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। আমিও পাঁচ তলায় উঠতে লিফট ব্যবহার করি, আমিও ৩০ টাকার জিনিস ২০ টাকায় দরাদরি করতে সংকোচবোধ করি। ভোজন রসিক হওয়াটাও প্রাথমিক পর্যায়ের একটা পাপ। যদিও আমি এ ব্যাপারে বেশ সচেতন। কেননা যেকোনো আইটেম হলেই আমার ক্ষুধা নিবারণ হয়ে যায়। খাবারের ক্ষেত্রে আইটেম বাছাই করা আমার আদর্শে শোভা পায় না। তাই খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে কখনোই অতি রঞ্জিত হওয়া যাবে না। একেকজনের স্বাদ-রুচি একেক রকম সেটাও সত্য এবং অবশ্যই অবশ্যই আমার পক্ষ হতে সম্মান পাওয়ার যোগ্য। তবে সেটা ভিন্ন বিষয়।
সর্বশেষ বলতে চাই 'মাছে-ভাতে বাঙালি' বলতে আমরা যেই সহজসরল-ভোজন রসিক কাল্পনিক চরিত্রকে কল্পনা করেছিলাম, আজ তার অস্তিত্ব অনেকাংশেই আমাদের ভোজন বিলাসিতার জন্য বিলুপ্তির পথে। পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যেন দুনিয়া থেকে আমরা 'ভোগ-বিলাসিতা' উপভোগের জন্যই নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখছি। পরিশেষে, যে কথাটি আমাদেরকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে সেটি হলোঃ
''খাওয়ার জন্য নিজেকে বাঁচিয়ে রাখব না,
বরং বাঁচার জন্য খাব।''

better luck for next blog.
ReplyDeleteThanks
Delete