লালন দর্শন - ইফফাত হাছান অমি


প্রায় সকল শ্রেণি পেশার মানুষই  গান শুনতে পছন্দ করে। গান হলো এমন একটা জিনিস যা মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়তে পারে দেশ বিদেশে। তাই গানের মাধ্যমে অতি সহজেই মানুষের ভিতর ঢুকে পড়া যায়, মানুষের কাছে চলে যাওয়া। তাই গানের ভিতর যদি এমন কিছু তুলে ধরা যায় যার অভাব মনুষ্যজাতিতে বিদ্যমান, তবে তা সকলে সহজেই উপলব্ধি করতে পারবে। বাংলা গানের জগতে যেসব ভাগগুলো রয়েছে তার মধ্যে লালন গীতি অন্যতম। লালন(১৭৭৪-১৮৯০)এর গানের লক্ষ্যনীয় মূল বিষয়টি হলো মানবজাতিতে বিদ্যমান জাত–পাতের ভেদাভেদ তথা মনুষ্যধর্মের অভাব। লালন ছিলেন একজন আধ্যাত্মিক সাধক, মানবতাবাদী, সমাজ সংস্কারক। তার গানের মাধ্যমে তিনি সমাজ সংস্করনের কাজ করায় জনমনে সর্বত্র তিনি তার সাধনার বাণী পৌঁছাতে পেরেছেন। লালনের নামটিকে একটি রূপক তিন অক্ষরবিশিষ্ট নাম কল্পনা করলে 'লা' মানে না, মহাশূন্য আর 'লা' কে যিনি লন বা গ্রহণ করেন তিনিই লালন। অর্থাৎ যে সাধক বস্তুবিশ্বের ভিড় ছাপিয়ে দেহমনে মহাশূন্যতাকে গ্রহণ করেন, তিনিই লালন। লালনকে নিয়ে জানার আগ্রহ সৃষ্টি হলে সকলেই সর্বপ্রথম লালনের জন্ম, পরিচয় এসব নিয়ে ঘাটাঘাটি করে। এখন পর্যন্ত যারাই লালনের এসব ব্যাপার নিয়ে তথ্য প্রকাশ করেছেন, কেউই লালনের সঠিক জন্ম, ধর্ম, পরিচয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারনা দিতে পারেনি। বস্তুত লালন কখনোই নিজের ধর্ম, বর্ণ, জন্ম, পরিচয় দিতে সন্তুষ্টি বোধ করেন নি। যা তার লিখনি থেকে প্রতীয়মান হয়-


      "সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে।

               লালন বলে জেতের কি রূপ

                   দেখলাম না এই নজরে।"

                   

নদীয়ায় ফকিরীর প্রবক্তা ছিলেন গৌরাঙ্গ। তার মা তাকে নিমাই নামে ডাকত। তিনি নদীয়া জেলায় আলাউদ্দীন হুসাইন শাহ(১৪৯৪-১৫১৯) এর আমলে সবচেয়ে বড় পন্ডিত ছিলেন। যার আরেক নাম ছিল শ্রী চৈতন্য। তার বাবা জগন্নাথ মিশ্র ছিলেন সিলেটের অধিবাসী। তৎকালীন সময়ে নদীয়া ছিল পান্ডিত্য অর্জনের বিখ্যাত স্থান। জগন্নাথ মিশ্র তাঁর পুত্র গৌরাঙ্গকে নদীয়ায় পাঠিয়েছিলেন শিক্ষা অর্জনের জন্য। গৌরাঙ্গ ছিল ব্রাহ্মণপুত্র। নদীয়ায় এসে তিনি হিন্দুসম্প্রদায়ের মধ্যকার জাত–পাতের বিভেদ লক্ষ করেন এবং এর বিরুদ্ধে অপারগতা প্রকাশ করেন। অতঃপর তিনি জাত-পাত, ধনী-নির্ধন ও নারী-পুরুষের বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। তিনি সকলকে প্রেম-ভালোবাসা দ্বারা জাত-পাতের বৈষম্য ছিন্ন করার আহ্বান জানান। কিন্তু ঐ সময়ে এই দুঃসাহসটা মোটেও সহজ ছিল না। ফলস্বরূপ নদীয়ায় অবস্থানরত জাত পাতে বিশ্বাসী ক্ষমতাধর ব্রাহ্মণরা তাকে মাত্র ছয়মাস না পেরুতেই নদীয়া থেকে তাড়িয়ে দেন। তবে তিনি যাওয়ার আগে তাঁর সহযোদ্ধা হিসেবে নদীয়ায় নিত্যানন্দকে ছেড়ে যান। তিনি এ আন্দোলন চালিয়ে যান। এটি আধ্যাত্মিক লড়াই ছিল না, রাজনৈতিক লড়াই ছিল। চৈতন্য ও নিত্যানন্দের ধারা বেয়ে উদ্ভুত হন ফকির লালন শাহ। নদীয়া জেলায় বেড়ে ওঠা কালীন হিন্দুধর্ম, খ্রিষ্টধর্ম ও ইসলাম ধর্মের সঙ্গে লালনের একধনের ঘনিষ্ঠতা ছিল। লালন শাহের ঐ সময়ে পুরো নদীয়া জেলায় খ্রিস্টান মিশনারী ও হিন্দু ধর্মতাত্ত্বিকগনের বিরাট প্রভাব ছিল। এসময় তিনি মনুষ্যজাতির মধ্যে বিশেষ অস্থিরতা লক্ষ্য করেন। সবাই একসাথে চলছে ফিরছে তবুও সমাজের একাংশ অবহেলিত। জাত, পাত, ধর্মে বিভক্ত মনুষ্যকূল। বিশেষ করে তৎকালীন হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝে উঁচু জাত-নিঁচু জাত ও বংশ পরিচয় দ্বারা সৃষ্ট ভেদাভেদ বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল। লালনের বিশ্বাস ছিল যে জাত, পাত, ধর্ম দ্বারা কখনোই বিচার করা যায় না। তাই তার ভিতর সকল ধর্ম নিয়ে জানার কৌতুহল সৃষ্টি হয়। হিন্দু ও ইসলাম ধর্ম নিয়ে তার বিশেষ জ্ঞান ছিল। লালন তার দর্শনকে পরিষ্কার করতে গিয়ে প্রথাগত ধর্মবিশ্বাসের বাইরে গিয়ে একটা নিরপেক্ষ অবস্থান নেন এবং তার শৈশবের দীক্ষাগুরু সিরাজ সাঁইয়ের দেখানো পথে অগ্রসর হন। লালন দর্শন সম্পর্কে জানার প্রধান উৎস তার গানসমূহ। লালন মূলত সমাজের নানান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে মুখে মুখে গান বানাতেন। তাঁর ভক্তরা সেগুলো শুনে নিজের মধ্যে ধারণ করত। পরবর্তীকালে লালনের গানগুলো নিয়ে গবেষণাকারী সাহিত্যিকদের মধ্যে আবু রুশদ মতিনউদ্দিন অন্যতম। আবু রুশদ চল্লিশের দশকের প্রধান কথাসাহিত্যিকদের একজন। আবু রুশদ কর্তৃক অনুবাদকৃত 'সংস অব লালন' বা 'লালন শাহের গান' গ্রন্থে তিনি লালনের গানকে সাতটি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। এগুলো হলো-

১. হিমস বা প্রশস্তি(প্রশংসা)

২. ডিভোশনাল সংস বা ভক্তিসংগীত

৩. বডি মিস্টরি বা দেহতত্ত্ব

৪. সেলফ নলেজ বা আত্মতত্ত্ব

৫. ইনকোয়ারি বা আত্মজিজ্ঞাসা

৬. আলটিমেট নলেজ বা পরমতত্ত্ব

৭. মিসলেনিয়াস বা বিবিধ


এগুলোর মানে বুঝতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই লালনের ইতিহাস ও গান রচনার প্রাক্কাল সম্পর্কে জানতে হবে।


১.হিমসঃ


হিমস মানে প্রশস্তি বা প্রশংসা। হিমস বলতে বোঝায় মৃত হয়ে গিয়েছে এমন কোনো বিশেষ ব্যক্তির প্রশংসা বর্ণনা করা। লালন মূলত তাঁর গানে শ্রী চৈতন্যের প্রশস্তি গেয়েছেন। লালন চৈতন্যবাদের প্রশস্তি গাইলেও চৈতন্যের সন্নাসবাদকে স্পষ্টাক্ষরে ব্যঙ্গ করেছেন-

              "কেউ নারী ছেড়ে জঙ্গলে যায়,

                 স্বপ্নদোষ কি হয় না সেথায়,

                 আপন মনের বাঘে যারে খায়

                                        কে ঠকায় রে।"

                                        

আবার, লালনের শচী মাতা(শ্রী চৈতন্যের মাতা) বলেন- 

             "ঘরে কি হয় না ফকীরী

             কেন হলি রে নিমাই আজ দেশান্তরী ||

             

           °        °        °        °       °      °       °       °


            ঘরে ফিরে চল রে নিমাই

            ঘরে সাধলে হবে কামাই

            বলে এই কথা কাঁদে শচীমাতা

                      লালন বলে লীলের বলিহারী"||

                      

লালন চৈতন্যের প্রশস্তি গাওয়া সত্ত্বেও, চৈতন্যের সন্ন্যাসবাদ বিষয়ক এরূপ গীতি কি সত্যিই চৈতন্যের সমর্থন সূচক কথা? এ প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক। 


কবি রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে লালনশাহী এই মনোভাবের চমৎকার ব্যাখ্যা করেছেন তার 'ক্ষনিকা' কাব্যে-

        "আমি হবনা তাপস হবনা হবনা

              যদি না মেলে তপস্বিনী ||"

অথবা তাঁর স্পষ্ট উক্তি -

               "আমি বৈরাগ্যের নাম করে

                           শূন্য ঝুলির সমর্থন করিনে"।

অর্থাৎ, লালন চৈতন্যের জাত পাত বিরোধী মনোভাব বিষয়ক প্রশস্তি গাইলেও, চৈতন্যের সন্নাসবাদকে সমর্থন করেন নি। ফকিরী সমাজে নারী পুরুষের কোন ভেদাভেদ নেই। নারীদেরকে সম্মান করা হয়। পুরুষরা কোথাও গেলে, সাথে নারীকে নিয়ে যাওয়াটা অনেকটা রীতির মধ্যেই পড়ে। নারীর গুরুত্ব প্রদানে ফকিরী সমাজের এ ভাব বর্তমান সময়ের খুবই প্রয়োজনীয় একটি বিষয়। অল্প বয়সে বর্তমানে বাবা মা তাদের মেয়েদেরকে গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করতে পাঠান। ফকিরী ভাবমতে এটি সন্তান বিক্রির সাথে তুলনীয়।


২.দেহতত্ত্ব, আত্মতত্ত্ব, আত্মজিজ্ঞাসা, ভক্তি ও পরমতত্ত্বঃ


বাউলরা মূলত তাদের গানের পরিবেশনায় গানের পাশাপাশি সুফিবাদ ও দেহতত্ত্ব মতাদর্শ প্রচার করে থাকে। বাউলসমাজ ‘দেহতত্ত্ব’র সাধনার মাধ্যমে পরমাত্মার সন্ধান করে। তাদের গানগুলোতে খাঁচা, মানুষ, মনের মানুষ, অচিন পাখি, মনুরায় ইত্যাদি রুপক বা প্রতীকী ভাষায় তারা পরমাত্মাকে অভিহিত করে। যেমন- লালন শাহের গান ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’। পরমাত্মা মানবদেহে বাস করে বলে বাউলদের বিশ্বাস। পরমাত্মার সাথে মানবাত্মার মিলন সাধন তাদের দেহসাধনার মূল লক্ষ্য; অধ্যাত্মপ্রেম তথা ভক্তি দ্বারা এ মিলন সাধন সম্ভব।


বাউলদের দেহকেন্দ্রিক অধ্যাত্ম সাধনা প্রধানত গুরু-নির্ভর; গুরুর কাছে দীক্ষা নিয়ে যোগাদি সাধনা এবং নানা আচার পালন ও রীতিনীতি করতে হয়। এ দেহ, আত্মা, পরমাত্মা, গুরু, প্রেম-ভক্তি, সহনশীলতা, সৃষ্টিরহস্য ইত্যাদি বিষয়কে কেন্দ্র করে বাউল গান রচিত হয়েছে।

লালনের মূল আদর্শ ছিল জাত-পাতকে প্রেম-ভক্তি,সহনশীলতা দ্বারা জয় করা। লালন দর্শনের অনুসারীরা কখনোই ধর্মে ধর্মে অসহনশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে না। একসাথে সবাই স্বাধীন সার্বভৌমভাবে বসবাস করতে পারবে। স্থান পাবে মনুষ্যধর্ম। সবাই সবার নিজস্ব উপায়ে স্রষ্টাকে খোঁজায় ব্রতী হবে। থাকবে না কোনো ঘাত সংঘাত। তাছাড়াও লালন সমাজের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে, বিভিন্ন সময়ে গান রচনা করেছেন। আবু রুশদ এসব গানকে 'বিবিধ' এ স্থান দিয়েছেন। সর্বোপরি লালন দর্শন আমাদেরকে সহনশীলতা, আত্মউন্নয়ন, স্রষ্টার সাথে আত্মিক যোগাযোগের শিক্ষা দিয়েছে। আমাদের উচিত লালনের দর্শন সম্পর্কে সম্মুখ ধারনা অর্জন করা। তাঁর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা। তাঁর দেখানো মনুষ্য ধর্মকে ধারন করে সহনশীল হয়ে ওঠা।

Comments

Popular posts from this blog

কালো ডিম - পর্ব ০১ (গল্প-সল্প)

আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে আনার ১০১ টি উপায়

কালো শাড়ি - পর্ব ০৩(গল্প-সল্প)