কালো শাড়ি - পর্ব ০৩(গল্প-সল্প)
দরজাটা খুলে দেখলাম আম্মু এসেছে।
-কিরে তোর আম্মু কোথায় গিয়েছিল?
-বাড়িওয়ালা আঙ্কেল গলায় ফাঁস নিয়েছেন, আন্টিকে দেখতে গিয়েছিল আম্মু।
কথাটা শুনে বাবা ধপাস করে বসে পড়ল। নিশ্চুপ হয়ে পড়ল।
বাবা ফ্রেশ হয়ে আসার পর আম্মু বাবাকে খাবার দিলেন। বাবা আর একটি কথাও বলছেন না।
-কি হয়েছে বাবা? তুমি কি যাবে সেখানে?
মাথা নাড়িয়ে না উত্তর দিলেন। বাবাকে হিমেলের আত্মহত্যার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেও বাবার আচরণের অভিন্ন বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করা যায়।
আমার কলেজে যাওয়ার সময় হয়েছে। আজকে আমার ফিজিক্স পরীক্ষা। কথায় কথায় ভুলতে বসেছি প্রায়। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লাম। বের হওয়ার আগে বাবাকে বললাম সময় পেলে যেন আমার জন্য একটা টেবিল ঘড়ি কিনে আনে। বাবার কাছ থেকে কোনো জবাব পেলাম না। বাসা থেকে বেরিয়েই বটগাছটার দিকে তাকালাম। বার বার বটগাছটাকে দেখে খারাপ লাগছিল। অনেকগুলো পাতাই পুঁড়ে কুচকে গিয়েছে। অনেকগুলো পাতা ঝরেও পড়েছে। বেশ বয়স হয়েছে বটগাছটার। এই বটগাছটার সাথে অনেক স্মৃতি আর আবেগ জড়িয়ে আছে আমার। পথে এসে মনে পড়লো ক্যালকুলেটর নিই নি। এখন ক্যালকুলেটরের জন্য বাসায় গেলে অনেক দেরি হয়ে যাবে। হঠাৎ বিকাশের সাথে দেখা হলো। কাঁধে সেই স্কুল ব্যাগ।
-কেমন আছো বিকাশ?
-ভালো আছি ভাইয়া। আপনি কেমন আছেন?
-তোমার কাছে সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর আছে?
-জ্বি ভাইয়া।
-আমাকে দিতে পারবে একটু? আমি বাসা থেকে ক্যালকুলেটরটা আনতে ভুলে গিয়েছি। আজকে আমার ফিজিক্স পরীক্ষা। তোমাকে আবার দিয়ে দেব। বিকেলে কোচিংয়ে যাওয়ার সময় আমাকে ডাক দিলেই হবে। আমি দিয়ে দেব তোমাকে।
-আচ্ছা ভাইয়া।
বিকাশের কাছ থেকে ক্যালকুলেটর নিয়ে তাকে পাশ কাটিয়ে একটু সামনে এগিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলাম,
-কাল কোচিং থেকে বাড়ি যাওনি কেন?
-কোচিং সেন্টারের ঐ এলাকায় আমার এক ফুপুর বাসা। কাল আমার ফুপাতো বোনের জন্মদিন ছিলো। তাই কাল রাতে সেখানেই ছিলাম।
আর কথা না বাড়িয়ে কলেজের দিকে রওনা হলাম।
পরীক্ষা শেষে কলেজ গেইট দিয়ে বের হওয়ার সময় দেখলাম টং দোকানে মিতুল, মাহাদী, সালমানরা চায়ে পাউরুটি ডুবিয়ে খাচ্ছে আর আড্ডা দিচ্ছে। টং দোকানে দাঁড়িয়ে চা খাওয়ার অভ্যাস না থাকলেও হঠাৎ কেন জানি চা খাওয়ার সুপ্ত ইচ্ছা জাগ্রত হলো। আমিও ওদের সাথে সামিল হলাম। আমি রং চা নিলাম। কারেন্ট মামার চা এই এলাকায় বেশ সুপরিচিত হলেও আগে কখনো কারেন্ট মামার চায়ে চুমুক বসানোর সৌভাগ্য আমার হয়নি। মিতুল আমাকে বলল,
-ঝিলিক ম্যামের কাহিনি শুনেছিস?''
-বাংলা ঝিলিক ম্যাম? নাকি শাড়ি ঝিলিক ম্যাম?
-শাড়ি ঝিলিক ম্যাম।
-কি হয়েছে?
-ম্যাম নিখোঁজ হয়ে গেছে।
-কি বলিস? সবসময় ইয়ার্কি ভাল্লাগে না।
কারেন্ট মামা বলল,
-কথা সত্য
-বলেন কি? কোথায়? কিভাবে?
-শুনলাম রামগড়ের মোল্লা রিসোর্টে উনি আর ওনার স্বামী ঘুরতে গিয়েছিল? তারপর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। পুলিশ তদন্ত করছে।
চায়ের কাপটা রেখে দিলাম। কারেন্ট মামাকে দশ টাকা দিয়ে উঠে পড়লাম। হাঁটতে লাগলাম বাসার দিকে। আমার দিনগুলো ইদানীং ভালো যাচ্ছে না। আমাদের কলেজে দু'জন ম্যামের নাম ঝিলিক। যিনি বাংলা পড়ান ওনাকে আমরা বোঝার সুবিধার্থে বাংলা ঝিলিক ম্যাম বলে ডাকি। আর যিনি নৃত্য ক্লাবে নাচ শেখান ওনাকে আমরা শাড়ি ঝিলিক ম্যাম বলে ডাকি। কলেজের স্টুডেন্টরা এই নামকরণটা ম্যামকে খেপানোর জন্যই করেছে। কেননা ম্যাম সবসময়ই কলেজে কালো রঙের একটা শাড়ি পরে আসতো। আমার কলেজ জীবনে কখনোই ম্যামকে ঐ কালো শাড়িটা ছাড়া অন্য কোনো পোশাকে দেখিনি। ম্যাম এর কি অনেকগুলো কালো শাড়ি? নাকি একটা কালো শাড়িই প্রতিদিন পরে আসেন? তা জানার মতো সৌভাগ্য বা দূর্ভাগ্য কোনোটিই আমার আজ পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি। এজন্যই ম্যামকে স্টুডেন্টরা আড়ালে 'শাড়ি ঝিলিক ম্যাম' বলেই ডাকে। এসব ভাবতে ভাবতে বাসার অনেকটা কাছেই চলে এলাম। রাস্তার পাশের ময়লা ড্রেনটার উপর নজর স্থির হলো। ময়লায় গাদাগাদি হওয়া সরু ড্রেনে আধডোবা হয়ে একটা মানিব্যাগ আটকে আছে। মানিব্যাগটা একটু বড়ো–সড়ো। মানিব্যাগটা হাতে নিতে ইচ্ছে করছিল না। কেননা রাস্তায় কুড়ানো কোনো জিনিসই তোলার বদঅভ্যেস নেই আমার। কিন্তু মানিব্যাগটা ড্রেনে তলিয়ে যাবে ভেবে না চাইতেও মানিব্যাগটা হাতে তুললাম। মানিব্যাগটা খুললাম। ভেতরে একটি টাকাও নেই। একটি ভিজিটিং কার্ড পেলাম। কার্ডটা একটা শাড়ির দোকানের। ডানপাশে আলোকভেদ্য একটি পকেট। সেখানে কারো ছবি আছে। ছবিটা ভেতর থেকে খুললাম। ছবিটা একজন মহিলার। কালো রঙের একটা শাড়ি পরা৷ চেহারাটা অস্পষ্ট। ড্রেনের নোংরা পানিতে ছবিটার অর্ধেক নষ্ট হয়ে গেছে। ছবিটার উল্টো দিকে একটা সময় লিখা আছে। তিনটা তেত্রিশ। তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না থাকায় মানিব্যাগটা ফেলে দেওয়ার সময় দেখলাম চেইনযুক্ত একটি পকেট আছে মানিব্যাগটাতে। চেইনটা জ্যাম হয়ে আছে। খুলছে না। তাই মানিব্যাগটাকে বাসায় নিয়ে গিয়ে রেখে দিলাম বুক শেলফে, হিমেল এর সেই বইটার ফাঁকে। খাবার খেয়ে ফ্রেশ হয়ে মানিব্যাগটা নিয়ে চেইনটা খোলার চেষ্টা করতে লাগলাম। বহু চেষ্টার পর চেইনটা খুলে দেখতে পেলাম একটা ক্রেডিট কার্ড। এটা দেখে ভাবলাম মানিব্যাগটাকে মালিকের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া উচিৎ। আমার মানিব্যাগ কিংবা গূরুত্বপূর্ণ কোনো জিনিস যদি হারিয়ে যায় এবং তা যদি কেউ খুঁজে পায়, তবে আমিও তার কাছ থেকে একই দায়িত্ববোধটাই আশা করতাম। তাহলে আমি কেন আরেকজনকে নিরাশ করব। জীবনের চলার পথে যখন আমরা কোনো বিপদের সম্মুখীন হই তখন আমরা আশা করি যেন সবকিছুই আমার অনূকূলে চলে আসে। এই আশা করাটা দোষের কিছু নয়। কিন্তু অন্যের কঠিন সময়েও একই বিষয় আশা করাটাই দোষের। মানিব্যাগটাকে সযত্নে লুকিয়ে রাখলাম হিমেলের সেই আধপোড়া বইয়ের ফাঁকে। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে প্রায়। বটগাছ তলে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসলেও কেন জানি মন চাচ্ছিল না। তাছাড়া সন্ধ্যার সময় হালকা ঠান্ডাও অনুভূত হচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে শীতকাল আসতে চলেছে প্রায়। তাই বটতলে হাওয়া খাওয়ার প্রয়োজনীয়তাটাও কমতে চলেছে প্রায়। যদিও এখনো তেমন শীত পড়ছে না। এত ভাবনা চিন্তাকে এক পাশে রেখে একটি বড় কাগজে মানিব্যাগ হারানোর বিষয়টা মোটা কালির কলম দিয়ে লিখে ঝুলিয়ে দিলাম বটগাছের একটা ডালে। কাগজে যুক্ত করলাম বাবার টেলিফোন নম্বর। সেদিন আর বটগাছ তলে বসতে ইচ্ছে না করায় কাগজটা ঝুলিয়েই বাসায় ফিরে এলাম। বারান্দায় বসে তাকিয়ে ছিলাম বটগাছটার দিকে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টটা তখন জ্বলছিল। আকাশে এখনো আবছা আবছা আলো দৃশ্যমান। আকাশে একঝাঁক পাখি গন্তব্যে ফিরছিল তখন। আগে কোনোদিন এতো পাখি একসাথে উড়ে যেতে দেখিনি। অবশ্য এটি অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার নয়। কেননা যেসব দেশে ইতিমধ্যেই তীব্র শীত শুরু হয়ে গিয়েছে সেসব দেশ থেকে প্রতিবছরই হাজার হাজার অতিথি পাখি তীব্র শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচার জন্য এদেশে এসে ভীড় জমায়। আগামীকাল পরীক্ষা নেই। রুমের ভেতর চলে গেলাম। কেমিস্ট্রি বইটা খুললাম। হঠাৎ টেবিলের কোণায় দেখলাম কালো রঙের একটি টেবিল ঘড়ি। ঘড়িটা অ্যানালগ। বাবা এনেছে হয়তো। সকালে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে একটা টেবিল ঘড়ির কথা বলে গিয়েছিলাম। বাবা ঠিকই জানত আমার প্রিয় রং কালো। তাই কালো রঙের ঘড়িই এনেছেন। ঘড়িটাতে একটা পাখির প্রতিকৃতি আঁকা আছে। ঘড়িটার পেছন দিকে একটা বাটন ও দুইটা চাকার মতো আছে। চাকা দুটোর একটি সময় সংশোধন ও অপরটি অ্যালার্ম দেওয়ার কাজ করে। আর বাটনটা অ্যালার্ম অন অফ করার কাজে ব্যবহৃত হয়। এ ব্যাপারগুলো ঘড়িটার গায়ে খোদাইকৃত চিহ্ন থেকে ঠিকই বুঝতে পেরেছিলাম। ক্ষনিকের জন্য নিজেকে বেশ চালাক মনে হতে লাগল। যদিও এটা জানাটা তেমন গৌরবের কিছু নয়। অবশ্য সেটা ভেবেও ক্ষনিকের জন্য একটু লজ্জাবোধ হচ্ছিল। ঘড়িটাতে তখন আটটা বেজে ছাব্বিশ মিনিট। আটটা সাতাশের উদ্দেশ্যে অ্যলার্ম নির্ধারণ করলাম। ঘড়িটা অ্যালার্ম দেওয়ার সময় কিভাবে আওয়াজ করে সেটা জানার জন্যই এমনটি করেছিলাম। আটটা সাতাশ বাজল। অ্যালার্ম বেজে উঠল। এটা ছিল একটা পাখির আওয়াজ। তবে সচারচর এমন পাখির আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায় না। তাছাড়া অ্যালার্ম হিসেবে পাখির এই আওয়াজকে বড়ই বেমানান লাগছিল। ঘড়ির অ্যালার্মে পাখির আওয়াজ থাকাতেই হয়তো ঘড়ির গায়ে পাখির প্রতিকৃতি অংকিত ছিলো। আওয়াজটা বেশ ভালোই স্পষ্ট। আওয়াজটা কোন পাখির তা অজানা হলেও এই পাখির আওয়াজটা যেন কোথায় শুনেছি বলে মনে হচ্ছিল। অ্যালার্ম এর বাটনটা অফ করে রাখলাম। কেননা আপাতত এর কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই আমার। ঘড়িটা পাশে রেখে পড়তে লাগলাম। বেশ কিছুক্ষণ পড়ার পর দেখলাম ঘড়িটার মিনিটের কাঁটা তেরো বরাবর এবং ঘন্টার কাঁটাটা দশ কে খানিকটা অতিক্রম করেছে। আম্মু খাবারের জন্য ডাক দিলেন। সপরিবারে খাবার খেতে বসলাম। শুনেছি খাওয়ার সময় কথা বলাটা ঠিক নয়, অস্বাস্থ্যকর। কিন্তু যখন পুরো পরিবার একসাথে কোনো কাজ করে, সেটা খাবার খাওয়া বা অন্য কোনো কাজ করাই হোক না কেন, পরিবারভিত্তিক সেই মজলিসে কথাবার্তা, হাসি–ঠাট্টা মানসিক স্বাস্থ্যে চিরস্থায়ী প্রফুল্লতা এনে দিবে। এটা আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস। যারা এই সুন্দর মূহুর্তকে উপভোগ করতে পারে তারা অস্বাস্থ্যকর কাজকেও প্রেম-প্রীতি দিয়ে জয় করার ক্ষমতা রাখে। রাতের খাবারে বেশ তৃপ্তি পেলাম। বাবা প্রতিদিন খাবারের সময়ে, অফিসে প্রতিদিন কি ঘটে না ঘটে সে ব্যাপারে আলাপ-সালাপ করেন।
-বাবা, তুমি ঝিলিক ম্যামের কেইসটার ব্যাপারে জানো?
-শুনেছি। কিন্তু সেটা রামগড় থানার কেইস।
নিশ্চুপ হয়ে রইলাম। খাওয়া শেষ। উঠে রুমে গেলাম। টেবিল ঘড়িটাতে দেখলাম তখন দশটা সাইত্রিশ বাজে। রুমের বাতিটা নিভালাম। রুমে এখন আবছা আলো। বাহির থেকে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো আসছে। চশমাটা খুলে টেবিলে রাখতে গেলাম। হঠাৎ টেবিল ঘড়িটা মেঝেতে পড়ে গেল। আমার হাতের ধাক্কা লেগে এমনটি হয়েছে। টের পেলাম যে ঘড়ির ব্যাটারিটা খুলে গিয়েছে। কোনোমতে আবছা আলোতে ব্যাটারি ও এর ঢাকনাটি খুঁজে পেলাম। ব্যাটারিটি আটকানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু ব্যাটারি কেসটা বেশ শক্ত ছিল। বহু জোরাজোরির পর ব্যাটারিটি আটকাতে সক্ষম হলাম। বহু চেষ্টার পর টেবিল ঘড়িটি সঠিকভাবে সঠিকস্থানে রাখতে সক্ষম হলাম। বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম। শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলাম আমি কতটা অলস হয়ে যাচ্ছি দিন দিন যে একটা ব্যাটারি আটকানোর জন্যও রুমের বাতি জ্বালাতে দ্বিধা করতে ভুলিনি। এমনভাবে দিন চললে হয়তো কোনোদিন ভূত এসে বলবে, ''কি হে, বটগাছের মগডালে বসে কারেন্ট মামার চা খাবি?'' তখন হয়তো কাঁথার নিচের উষ্ণ অভ্যর্থনা রেখে কারেন্ট মামার চা খাওয়ার জন্য বটগাছের মগডালে যেতে অস্বীকৃতি জানাতেও ভুল করব না। আবার ভাবলাম, ভূত আমাকে কারেন্ট মামার চা খেতে দাওয়াত দিয়ে হয়তো আমাকেই চিবিয়ে খাবে। ধুর! ভূতই তো নেই। ভাবতে ভাবতে চোখ লেগে গেল। হঠাৎ ঘুম ভাঙল কিছু একটার আওয়াজে। হ্যা, এটা পাখির আওয়াজ, যেটা টেবিল ঘড়ির অ্যালার্মের সময় বেজে ওঠে। কিন্তু আমি তো ঘড়িটাতে কোনোরূপ অ্যালার্মই নির্ধারণ করিনি। তাহলে এমনটি কেন হলো? কিভাবে হলো? চোখ খুললাম। দেওয়াল ঘড়িতে দেখলাম সময় তখন তিনটা বেজে তেত্রিশ মিনিট। অর্থাৎ টেবিল ঘড়িতে তিনটা বেজে তেত্রিশ মিনিটে অ্যালার্ম বেজেছে। দেওয়ালের গায়ে তখন রাস্তার ল্যাম্পপোস্টটির আলো বারান্দার জানালা দিয়ে এসে পড়ছিল। আর তাতে কিসের যেন ছায়া নাড়াচাড়া করছিল। ছায়াটি দেখে এমন মনে হচ্ছিল যেন কোনো এক মহিলা শাড়ি পরে নৃত্য পরিবেশন করছে। টেবিলটা খাটের বেশ নিকটে থাকায় আমি খাটে শুয়ে থেকেই টেবিলের উপরে থাকা চশমাটা নিলাম। ভালোমতো আবার তাকিয়ে দেখলাম। হ্যাঁ, আমি ভুল দেখিনি। এমন মনে হচ্ছিল যেন কোনো মহিলা শাড়ি পরিহিত অবস্থায় নাচছে। বারান্দার দরজা খুললাম। বারান্দায় গিয়ে দেখলাম সেখানে কেউই নেই। ভালো মতো আশপাশে নজর দিলাম। কাউকে দেখতে পেলাম না। বটগাছ তলেও ভালো মতো দেখলাম। কাউকে দেখতে পেলাম না৷ হঠাৎ বটগাছে আমার টাঙানো কাগজটার দিকে নজর স্থির হলো। দেখলাম সেটি এখন আর ঝুলে নেই বরং গাছের নিচে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। রুমে এসে দেখলাম ছায়াটিও এখন আর নেই। বটগাছ থেকে আমার টাঙানো কাগজটার পতনের ব্যাপারটা দেখে অদ্ভুত লাগলেও এটা অসম্ভব কিছু নয়। কারণ বাতাসে এটি খুলে পড়ে যেতেও পারে। কিন্তু অস্বাভাবিক লাগছিল কোনো শাড়ি পরিহিত মহিলার নাচের ছায়ার বিষয়টা। হঠাৎ ঝিলিক ম্যামের কথা মনে পড়ে গেল। যেন এমন অনুভব করলাম যে ঝিলিক ম্যামই কালো শাড়িটা পরে ছায়ার ভিতর নাচছিল। এর আগেও আমি বহুবার ঝিলিক ম্যামের নাচ দেখেছি। বারবার কেন জানি ঝিলিক ম্যামের নাচের সাথে ছায়ার নাচকে গুলিয়ে ফেলছিলাম। ঝিলিক ম্যামের কথা মাথায় আসার পর এমনটি মনে হচ্ছিল? নাকি ছায়ার নাচটি সত্যিই ঝিলিক ম্যামের নাচের মতো ছিল? সেটিই ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। রুমের বাতি জ্বালানোর জন্য সুইচ অন করলাম। কিন্তু বাতি জ্বলছিল না। কারণ সেসময় লোডশেডিং চলছিল। তাই মোম জ্বালালাম। মোমের আলোতে বুকশেলফটার সামনে গেলাম। হিমেলের সেই বইটার ফাঁক থেকে কুড়িয়ে পাওয়া মানিব্যাগটা বের করলাম৷ নজর স্থির হলো সেই কালো শাড়ি পরা মহিলাটির ছবিটার উপর। যার মুখটা ছিল অস্পষ্ট এবং ছবিটার উল্টো পিঠে লিখা ছিল তিনটা তেত্রিশ।
সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই চলে গেলাম বটগাছটার কাছে। নিচে পড়ে থাকা কাগজটিকে উঠিয়ে পুনরায় বেধে দিলাম বটগাছটার সাথে। আবার বাসায় ফিরে এসে রুমে ঢুকলাম। টেবিল ঘড়িটার উপর নজর স্থির হলো। দেখলাম ঘড়িটি চলছিল না। দশটা বেজে একচল্লিশ মিনিট বরাবর থেমে ছিল ঘড়িটি। চলমান দেওয়াল ঘড়িতে তখন মাত্র সাতটা সতেরো বাজে। মাত্র গতকাল কিনে আনা টেবিল ঘড়িটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলো কেন, সেই কারণ উদঘাটনের জন্য ঘড়িটিকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ শুরু করলাম। তবে কি গতরাতে টেবিল থেকে পড়েই ঘড়িটি নষ্ট হয়ে গেল? ব্যাপারটা আরো পরিষ্কারভাবে জানার জন্য ব্যাটারির ঢাকনাটি খুললাম। খুলে দেখলাম গতরাতে ঘড়ির ব্যাটারিটি আমি উল্টো করে লাগিয়েছি। তার মানে কাল রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ঘড়িটি। তাহলে গতরাতে তিনটা তেত্রিশ মিনিটে কিভাবে ঘড়ির অ্যালার্মটি বেজেছিল সে ব্যাপারটিই হজম হচ্ছিল না। ব্যাপারটি বড়ই অস্বাভাবিক লাগছিল। বাইরে একটি গাড়ি থামার আওয়াজ পেলাম। বারান্দায় গিয়ে দেখলাম বিদ্যুৎ অফিস থেকে কিছু লোক এসেছে। তারা বটগাছের কিছু ডাল কাটতে লাগল৷ মূলত বটগাছের ডালগুলো বৈদ্যুতিক তারের সাথে লেগে যায় বলেই এমনটি করছিলেন তারা। হঠাৎ কাল রাতের ঘটনাটির কথা মাথায় আসলো। কাল রাতে হয়তো ল্যাম্পপোস্টের সামনে থাকা বটগাছের পুড়ে যাওয়া কুঁচকানো পাতাগুলোর ছায়াই দেয়ালে পড়ছিল। আর বাতাসে পাতাগুলো নড়ছিল বলেই হয়তো কোনো শাড়ি পরিহিত মহিলার নাচের ছায়ার মতো লাগছিল। এ কথাটা ভেবে মন বেশ হালকা হলো। রুমে ফিরে এসে ঘড়িটির ব্যাটারি সঠিকভাবে লাগালাম। সঠিক সময় নির্ধারণ করে ঘড়িটি পুনরায় টেবিলে রেখে দিলাম। নাস্তা সেরে একটু পড়তে বসলাম। কিছুক্ষণ পর বাবা পাশের রুম থেকে ডাক দিলেন। কিছুক্ষণ আগেই বাবা কোনো এক কারনে বাসার বাইরে গিয়েছিলেন। সবেমাত্র বাসায় ফিরেছেন। পাশের রুমে গেলাম।
-জ্বি, বাবা।
- বটগাছটায় দেখলাম একটা মানিব্যাগ হারানোর বিজ্ঞপ্তি টাঙানো। সাথে আবার আমার টেলিফোন নম্বরও যুক্ত আছে দেখলাম। এটা কি তুই করেছিস?
-জ্বি, বাবা। আমি তো তোমাকে ব্যাপারটা জানাতে ভুলেই গিয়েছিলাম।
-মানিব্যাগটাতে কি কি ছিল?
- একটা শাড়ির দোকানের ভিজিটিং কার্ড, একটা ক্রেডিট কার্ড, একটা কালো শাড়ি পরিহিত মহিলার ছবি। তবে মহিলাটির চেহারা স্পষ্ট নয়।
-মানিব্যাগটা এখন আছে তোর কাছে?
-জ্বি বাবা।
-যা, গিয়ে নিয়ে আয়।
আমার রুম থেকে মানিব্যাগটা নিয়ে বাবাকে দেখালাম।
-বাবা, তুমি কি এই মানিব্যাগের সঠিক মালিককে খুঁজতে আমাকে সাহায্য করবে?
-অবশ্যই। তবে মানিব্যাগটাতে ক্রেডিট কার্ডটি ছাড়া তেমন গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নেই। আর এই ক্রেডিট কার্ড দিয়েই মানিব্যাগের সঠিক মালিককে খুঁজে পাওয়া যাবে।
-হুম।
-একটা কাজ কর, তোর কাছে মানিব্যাগটা রাখ। আমি শুধু ক্রেডিট কার্ডটা নিচ্ছি। কাল অফিস যাওয়ার সময় কার্ডটা নিয়ে যাবো এবং এর সঠিক মালিককে খোঁজার চেষ্টা করব।
-তবে তাই করো।
বাবাকে শুধু ক্রেডিট কার্ডটা দিয়ে মানিব্যাগটাকে আবারো আমার রুমে এনে হিমেলের সেই বইটার ফাঁকে রেখে দিলাম।
সন্ধ্যায় বটতলায় গিয়ে বসলাম। সাথে নিয়ে গেলাম বিকাশের সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটরটি। বটগাছটার বেশিরভাগ ডাল কেটে ফেলায় বটগাছটিকে দেখতে অনেকটা উলঙ্গ লাগছিল। বটগাছটায় পাতা নেই বললেই চলে। তাই আশা করি গত রাতের মতো আজকেও কালো শাড়ি পরা নাচতে থাকা মহিলাটির ছায়াকে দেখতে হবে না। বিকাশের আসার সময় হয়েছে। বিকাশকে দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল। আমাকে দেখে কান থেকে ইয়ারফোন খুলে কালো ডিমের ভিতর ঢুকিয়ে রাখল। বিকাশকে ডাক দিলাম। কাছে আসল বিকাশ।
-ভাইয়া, কেমন আছেন?
-জ্বি ভালো, তুমি?
-আমিও ভালো।
-তোমার সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেরটা দেওয়ার কথা ছিল।
-জ্বি ভাইয়া।
বিকাশের হাতে তার সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটরটা তুলে দিলাম। বাসায় চলে গেলাম। কেমিস্ট্রি বইটা নিয়ে বসলাম। কেমিস্ট্রির সবচেয়ে বড় যমের নাম জৈব যৌগ। মিথেন, ইথেন, প্রোপেন, বিউটেন। শত বিক্রিয়ার এসব ক্যাচাল আর ভাল্লাগে না। পর্যায় সারণি টাটকা মুখস্থ করো, বিক্রিয়া মুখস্থ করো, যোজনী মনে রাখো। এটা সেটা আরো কতো কি! ধুর ছাই! পরীক্ষার আগের রাতে এসব নিয়ে চিন্তা করাটা মোটেও কল্যাণকর কিছু নয়। বরং তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়াটাই শ্রেয়। তাছাড়া পরীক্ষা চলাকালীন দিবসগুলোতে বাতাসে হয়তো কেউ ডায়াজিপাম মিশিয়ে দেয়। উন্মাদ হয়ে যাই মনে হয়। আর উন্মাদনায় ঘুম বেশ ভালো ভাবেই ভাগ বসায়। এতো ঘুম কোথা থেকে যে আসে বুঝি না। আম্মু ডাক দিলো,
-কিরে, রাতের খাবার খেতে আয়।
-আম্মু ইচ্ছে করছে না, আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
-কাল তো তোর পরীক্ষা। আরেকটু পড়ে নে।
-পরীক্ষার আগের রাতে বেশী পড়া অনুচিত, তা না হলে মাথায় হাওয়া ঢুকবে না। আর হাওয়া না ঢুকলে খাওয়া হজম হবে না।
-এসব মনিষীদের মতো কথা আমি বুঝি না বাপু। আচ্ছা না পড়লেও অন্তত দুমুঠো ভাত খেয়ে নে ঘুমানোর আগে।
-ইচ্ছে নেই বললাম তো।
-রাতের খাবার না খেলে একটা পাখির শরীরে যতটুকু মাংস থাকে, তার অর্ধেক পরিমাণ মাংস কমে যায়।
-তার মানে কি, একটা পাখি দুই রাতে খাবার না খেলে সে কঙ্কাল হয়ে যায়?
আম্মুর কাছ থেকে একথার কোনো জবাব পেলাম না। কারণ আমার আম্মু বাকি দশটা সাধারণ বাঙালি মায়েদের মতোই। তবে এসব মায়েদের অন্যতম সাধারণ এবং পবিত্র বৈশিষ্ট্য হলো তারা খুবই সহজ সরল প্রকৃতির হয়। যে যা বোঝাবে সেটাই বুঝবে। এরা সাধারণত আধুনিকায়ন ও আধুনিক কথা বার্তা বা থিওরি এড়িয়ে চলতে পছন্দ করেন। চোখ থেকে চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলাম। ঘড়িটা চলছিল। টিক টিক টিক। ঘড়িটা হাতে নিয়ে ভালো মতো দেখে নিলাম যে ঘড়িটিতে অ্যালার্ম নির্ধারণ করা আছে কিনা? না, অ্যালার্মের সুইচটি অফ করা। বুক শেলফে হিমেলের সেই বইটির ফাঁক থেকে কোনো কারণ ছাড়াই মানিব্যাগটা বের করলাম। সব কাজেরই উদ্দেশ্য থাকাটা বাঞ্ছনীয় নয়। মানিব্যাগটাতে থাকা ছবিটা বের করে দেখতে লাগলাম। কোনো রকম ক্লু পাই কিনা, সে উদ্দেশ্যে এমনটি করা। অনেকটা বাবার মতো গোয়েন্দা সাজার চেষ্টা। কালো শাড়ি পরা মহিলাটির মুখটা অস্পষ্ট। তবে এমন মনে হচ্ছে যেন মহিলাটির এ ছবিটি যখন তোলা হয়েছিল তখন তিনি নাচের ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। ছবিটির পেছন দিকটা উল্টালাম। সেখানে 'তিনটা তেত্রিশ' ছাড়া লক্ষ করার মতো আর কিছুই খুঁজে পেলাম না। রুমের বাতিটি নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম। বাহির থেকে অল্প অল্প শীতল হাওয়া বইছে। পাশের রুমের আলোটাও নিভে গেল। তার মানে আম্মু আর বাবাও শুয়ে পড়েছেন। প্রতিদিন ঘুমানোর আগে নানান কথা মাথায় আসে। ভাবছি টেবিল ঘড়ির অ্যালার্মে যে পাখিটার আওয়াজ শোনা যায় সে পাখিটার নাম কি হতে পারে? এটি আমার অজানা। কেননা আগে কখনো এরকম পাখির আওয়াজ শুনিনি কিংবা সচারাচর এই পাখিটিকে ডাকতে শোনাও যায় না।
হঠাৎ কিছু একটার আওয়াজে ঘুম ভাঙল। আরে হ্যাঁ, এটা তো সেই পাখির আওয়াজ যেটা আমার অ্যালার্মে ডাকে। তার মানে অ্যালার্ম বাজছে। পাখির আওয়াজটা বন্ধ হলো। কিন্তু আমি তো ঘুমানোর আগে ভালোভাবে দেখে নিয়েছিলাম যে অ্যালার্ম এর সুইচটা অফ করা আছে কিনা। সেটি তো তখন বন্ধ'ই ছিল। তবে অ্যালার্মটা কেন বাজছে। চোখ খুললাম। বাহিরের ল্যাম্পোস্টের আলোতে দেওয়াল ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি তিনটা বেজে তেত্রিশ মিনিট। উঠে বসলাম। কাঁথাটা এখনো গায়ে জড়ানো৷ টেবিলের উপর থেকে চশমাটা চোখে পরলাম। টেবিল ঘড়িটা তখনও চলছিল। টিক টিক টিক। টেবিল ঘড়িটা হাতে নিলাম। অ্যালার্মের সুইচটা অফ রয়েছে। কাল রাতের মতো আজও অ্যালার্ম বেজে উঠার ঘটনাকে মোটেও কাকতালীয় বলে মনে হচ্ছে না। হঠাৎ কিসের যেন ছায়া দেয়ালে এসে পড়লো। ছায়াটা হুবহু কাল রাতের ছায়াটির মতো দেখতে। ছায়াটি কালো রঙের। যদিও সব ছায়াই কালো রঙের হয়। একজন মহিলা শাড়ি পরা। তার অঙ্গ সঞ্চালন দেখে বোঝার বাকি নেই যে তিনি নাচছেন। তাড়াতাড়ি উঠে বারান্দার দরজা খুলে বারান্দায় গেলাম। সেখানে কেউ নেই। রাস্তায়ও কেউ নেই। শুধু ল্যাম্পপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা উলঙ্গ বটগাছ। যাতে একটিও পাতা নেই বললেই চলে। গত রাতে বটগাছটিতে পাতা ছিল বলে অনুমান করে নিয়েছিলাম যে ছায়াটি হয়তো কোনো পাতার হয়ে থাকবে। তবে আজ রাতের ছায়াটি কিসের সেটি মোটেও অনুমান করার মতো নয়। রুমে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। মনের ভেতরে একটা সুপ্ত ভয় অনুভব করলাম। তাই কাঁথা দিয়ে নিজের সর্বাঙ্গ মুড়ে নিলাম। চোখে প্রচন্ড ঘুম। তন্দ্রা লেগে এসেছে প্রায়। হঠাৎ আবারও বেজে উঠলো অ্যালার্মটি। সেই পাখির ডাক। বিরক্ত হয়ে বিছানা থেকে উঠে ঘড়িটার ব্যাটারি খুলে রেখে দিলাম। এবার নিশ্চিন্তে ঘুম দিলাম। অ্যালার্মটি হয়তো আর বেজে উঠে নি।
বাবা ডাকছেন। বহুকষ্টে চোখদুটো খুললাম।
-দরজাটা লাগিয়ে দে। আমি অফিস যাচ্ছি।
-দিচ্ছি।
দরজাটা আটকে ফ্রেশ হয়ে এলাম। আম্মু তখনও ঘুম থেকে উঠেননি। ইদানীং আম্মুর শরীরটা ভালো নেই। মুখ মোছার গামছাটা বারান্দায় ছিল। বারান্দা থেকে গামছাটা নিয়ে রুমে এলাম। বারান্দাটাকেও এখন ভৌতিক বলে মনে হয়। এসব হচ্ছে কি! আমি কি ভূতে বিশ্বাস করা শুরু করে দিলাম নাকি? না, না তা মোটেও হতে দেওয়া যাবে না। দরজার নিচে কিছু একটার ছায়া দেখতে পেলাম। পত্রিকাওয়ালা খবরের কাগজ দিয়ে গেছেন। পত্রিকাটা এনে বারান্দার টি-টেবিলের উপর ছুঁড়ে ফেলে রাখলাম। পত্রিকাটি পড়ার মতো সরিষা পরিমান আগ্রহও নিজের ভেতর কাজ করেনি। আম্মু উঠে নাস্তা দিল।
দরজায় কড়া নাড়লাম। পরীক্ষা শেষে বাসায় ফিরেছি। আম্মু দরজাটা খুলল। দরজাটা খুলেই আমার রুমের দিকে চলে গেল। আমি দরজাটা আটকালাম।
-আমার রুমে কি করছো আম্মু?
-কেন? আমি কি তোর রুমে যেতে পারি না?
-সেটা বলিনি, সচারাচর তো তুমি খুব একটা আসো না তাই বললাম।
-নিজের রুমের প্রতি কোনো খেয়াল রাখিস?
-কেন? কি হলো আবার?
প্রশ্নসূচক এই বাক্যটি আম্মুর নিকট ছুঁড়ে দিলেও, আমি কিন্তু ঠিকই জানি আম্মু কেন এই কথাটি আমাকে বলেছে? জামা-কাপড়গুলো সব এলোমেলো। কিছু খাটের উপর, কিছু চেয়ারের উপর, এমনকি খাটের নিচেও কয়েকটা আছে। বুকশেলফটার উপরেও একটা প্যান্টের কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে। জানিনা আম্মুর চোখে সেটা পড়েছে কিনা। বইগুলো সব এলোমেলো। এমনকি টেবিলের নিচেও কয়েকটা পড়ে আছে। মশারির একটি কোণা এখনো টাঙানো আছে। বিছানার চাদরের প্রায় অর্ধাশ মেঝের সাথে লেগে আছে। শুধু বালিশটাই ঠিকঠাক জায়গায় আছে। বুকশেলফের নিচে একটা কাটা কম্পাস দেখা যাচ্ছে। কাটা কম্পাস যে জ্যামিতি বক্সের সবচেয়ে অবহেলিত উপকরণ সেটার সবচেয়ে বড় জলন্ত উদাহরণ এটি ছাড়া অন্যটি হতে পারে না। বুকশেলফের বইগুলো ঠিকঠাক সাজানো আছে। কিন্তু বুক শেলফের ড্রয়ারগুলোর ভিতর কি অবস্থা সেটি আমার অজানা। এমনকি কিছু কিছু ড্রয়ারে কি আছে সেটিও আমি জানিনা। কেননা এই বাসায় আসার আগ থেকেই এই বুক শেলফটা এখানে আছে। বারান্দার অবস্থাতো আরো খারাপ করে রেখেছি আমি। মাকড়শার জালে ভরে গেছে বারান্দাটা। টি-টেবিলটার উপর খবরের কাগজের স্তুপ পড়ে আছে। বারান্দার রেলিং টা পাখিদের বিষ্ঠা জর্জরিত। নিজের রুমের ততটা যত্ন নিতে পছন্দ করি না। এ ব্যাপারে তেমন কোনো আগ্রহ নেই আমার। তাই কোনটা গোছালো আর কোনটা অগোছালো সে ব্যাপারে আমার খেয়াল নেই। আজ যখন আম্মু রুমে এসে বিষয়গুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল ততক্ষণে বুঝতে পারলাম আম্মুর দিকে প্রশ্নসূচক 'কেন' শব্দটি ছুঁড়ে দেওয়া উচিত হয়নি। তবে ততক্ষণে বেশ দেরি হয়ে গেছে। আম্মুর চোখের দিকে তাকাতে নিজেকে বড়ই অসহায়ের মতো লাগছিল। কেননা রুমটা একটু বেশীই অগোছালো হয়ে গিয়েছিলো। তবে সাধারনের দৃষ্টিতে আমার রুমটা অগোছালো ও বসবাস অনুপযোগী মনে হলেও আমি এমন পরিবেশই উপভোগ করি। ক্ষণিকের জন্য নিজেকে অসাধারণ মনে হলো। আবার মাথায় এলো শব্দটা 'অসাধারণ' না হয়ে 'অস্বাভাবিক'ও তো পারে। এটা ভেবে আবার আত্ম-লজ্জায়ও জর্জরিত হলাম।
-কি হয়েছে দেখতে পারছিস না বুঝি?
হাতে-নাতে ধরা পড়া চোরের মতো চুপ হয়ে রইলাম। কেননা আমার নিজের দৃষ্টিতেও রুমটাকে আজ বড্ড বেশিই অগোছালো মনে হচ্ছিল। নিজের জামা-কাপড়গুলোকে অসহায়ের মতো এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে অসহায়ের মতো পড়ে থাকতে দেখে মনে হচ্ছিল জামা কাপড়গুলোর যদি বাকশক্তি থাকতো তাহলে হয়তো একগাদা গালি মেরে বসতো আমাকে। বারান্দার রেলিংটাতেও আজ বড্ড বেশিই পাখির বিষ্ঠার উপস্থিতি টের পাচ্ছি। পাখিরা যে এতো কি খায় বুঝে আসে না। খায় ভালো কথা আমার বারান্দার রেলিংয়ে বসেই কেন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে হবে বুঝি না। মূলত আম্মু আজ আমার রুম পরিষ্কারের মিশন নিয়েই আমার রুমে পদার্পণ করেছেন। আম্মু রুম পরিষ্কার করায় মনোযোগী হলেন আর আমি ফ্রেশ হওয়ায়। ফ্রেশ হয়ে এসে দেখলাম রুমটা এখন বেশ অস্বাভাবিক লাগছে। এতদিন যেরকম ছিল সেটাই আমার জন্য স্বাভাবিক ছিল। তবে মনে হচ্ছে যেন রুমকে অস্বাভাবিকভাবে সজ্জিত করায় মৃদু ঠান্ডা হাওয়া রুমে প্রবেশ করা শুরু করেছে। আম্মু বুক শেলফের ড্রয়ারগুলো খুললেন। ড্রয়ারগুলোতে জ্যাম লেগে ছিল। বহু জোরাজোরির পর আম্মু ড্রয়ারগুলোকে খুলতে সক্ষম হন। উপরের ড্রয়ারটাতে বেশ পুরনো কিছু কাগজপত্র আছে। রঙিন টেলিভিশনের লাইসেন্স কার্ড পাওয়া গেল। সেটা দুই হাজার দুই সনের। রঙিন টেলিভিশন ব্যবহারের জন্য পূর্বের দিনে লাইসেন্স নিতে হতো। ব্যাপারটা বর্তমানে ভাবাটাই বেশ অস্বাভাবিক। কিছু কিছু কাগজ পোকায় খেয়েছে। আম্মু সেগুলোকে এক পাশে সরিয়ে রাখলেন। নিচের ড্রয়ারটাকে খুললেন। এতে বেশকিছু জামাকাপড় আছে। একটা আকাশি রঙের পাঞ্জাবি, মেরুন কালারের একটা হাফ হাতা শার্ট। সাথে পাওয়া গেল একটা নীল চেকের লুঙ্গি। আরো নিচে উল্টোতেই পাওয়া গেল একটা কালো শাড়ি। শাড়িটাকে চেনা চেনা লাগছে।কালো শাড়িটা ভালো করে দেখে আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। কাল রাতের ঘটনার কথা মনে পড়ল। আম্মুকে কাল রাতের ঘটনাটা বলবো কিনা ভাবছি? নাহ, আম্মুকে এসব বলা যাবে না। আম্মু এমনিতেই এসব ব্যাপারে খুব সেনসিটিভ। আম্মু জামা কাপড়গুলো ঝেড়ে ঝেড়ে ধুলা ছাড়িয়ে আবার গুছিয়ে জায়গা মতো রেখে দিলেন। রুম পরিষ্কার করার কাজ শেষ। এবার বারান্দা পরিষ্কারের পালা।
-দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি দেখছিস? আমাকে একটু সাহায্য করলে কি পাপ হবে নাকি?
-করছি, করছি। কি করতে হবে বলো?
-টি টেবিলের উপরের খবরের কাগজগুলো গুছিয়ে রাখ। আমি রেলিং টা পরিষ্কার করছি।
-আচ্ছা।
এমনিতেই চোরের মতো চুপ হয়ে আছি। তাই আর কথা বাড়ালাম না। খবরের কাগজগুলো গুছাতে লাগলাম। অবহেলিতভাবে ফেলে রাখা আজকের খবরের কাগজটার উপর নজর স্থির হলো। খবরের কাগজের উপরে রয়েছে আজকের তারিখ। ০৩ অগ্রহায়ণ,১৪২৩। শুক্রবার। খবরের কাগজগুলো ইদানীং বিজ্ঞাপনের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপন, স্টিল কোম্পানির বিজ্ঞাপন, সাবানের বিজ্ঞাপন, আরও কত কি! পাতার বহুলাংশ দখল করে আছে এসব রসালো বিজ্ঞাপন। এসব বিজ্ঞাপনে বড় বড় মডেলদের ছবি ব্যবহৃত হয়। এসব তবুও মানা যায়। তাই বলে শাড়ির দোকানের বিজ্ঞাপন? এতেও রয়েছে একজন মডেলের বিশাল আকৃতির এক ছবি। যেখানে একজন মহিলা পরে আছেন কালো রঙের একটা শাড়ি। এই মডেলটাকে চেনা চেনা লাগে। কোথাও যেন দেখেছি বলে মনে হচ্ছে। সঠিক মনে করতে পারছি না৷ লোকাল নিউজ পেপার হলে যা হয় আর কি। গুরুত্বপূর্ণ খবর যে নেই তা নয়। আবহাওয়ার খবর ছেপেছে। আবহাওয়ার খবর দেখে বোঝার বাকি নেই শীতকাল অতি সন্নিকটে। পত্রিকার শেষ পাতায় ছেপেছে অতিথি পাখিদের আগমনের খবর। শিরোনামঃ খাগড়াছড়িতে বেড়েছে অতিথি পাখিদের আনাগোনা। বেশ কৌতুহল নিয়ে বিস্তারিত পড়া শুরু করলাম। প্রতিবছরই শীতকালের অল্প কিছুদিন আগে কিংবা শীতের সময়ই দূর-দূরান্ত হতে অতিথি পাখিরা এদেশে এসে আশ্রয় নেয়। মূলত যেসব দেশে ইতিমধ্যেই তীব্র শীত। সেসব দেশের শীতের প্রকোপ আক্রমণ থেকে বাঁচতেই অতিথি পাখিরা এমনটা করে থাকে। শত-শত শুভ্র বক, বুনো শালিকের দল, টিয়ে, ময়না, ফিঙে, মাছরাঙা, সরালি, খুঁনতে হাঁস, বালি হাঁস, মানিকজোঁড়সহ বৈচিত্র্যময় অতিথি পাখিদের সমারোহ দেখা যায়। কখনো কখনো প্রকৃতির নিয়ম ভেঙে শীতের শেষেও এদের আগমন লক্ষ্য করা যায়। প্রতিবেদনটিতে প্রতিকী ছবি হিসেবে রয়েছে কালো রঙের একটা ফিঙে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, আমি কখনো সামনাসামনি কালো ফিঙে দেখিনি৷ ছবিতেই দেখেছি প্রতিবার। তাই এটির চালচলন, ডাক দেওয়ার ভঙ্গি নিয়ে কোনো সম্মুখ ধারনা নেই আমার। তবে প্রতিবেদনটির শেষ দিকটা পড়ে মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেলো। ইদানীং কিছু অসাধু লোভী ব্যক্তিরা এসব পাখি শিকারের উন্মাদনায় মেতে উঠেছে। যা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মূলত বন্দুকের সাহায্যে এমনটি ঘটানো হচ্ছে। এ কথাগুলো পড়ে মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেলো।
-তোকে খবরের কাগজ পড়তে দিই নি। গুছাতে দিয়েছি। কোনো কাজই তো ঠিকমতো করিস না। সবকিছুতে শুধু খামখেয়ালিপনা।
আম্মুর কথার কোনো জবাব না দিয়ে খবরের কাগজগুলো গুছিয়ে রাখলাম। আম্মু ততক্ষণে রেলিংটা পরিষ্কার করে ফেলেছে। রুম ও বারান্দা গোছানোর কাজ মোটামোটি শেষ। আম্মু রুম থেকে চলে গেলেন আমাকে খাবার দেওয়ার জন্য। পরক্ষণেই রুমে উঁকি দিয়ে আমার দিকে তাকালেন। মনে হচ্ছিল যেন এক্ষুনি একটা ধমক দিয়ে বসবেন।
-পরীক্ষা কেমন হয়েছে?
-হয়েছে মোটামোটি।
-তোর বাবাকে একটা কল দে। যেন আসার সময় কিছুটা লোহার তারের জাল নিয়ে আসে। এইট ফিট বাই সিক্স ফিট।
-কি হবে সেটা দিয়ে?
আম্মু আমার কথার জবাব না দিয়েই, আমাকে খাবার দেওয়ার জন্য চলে গেলেন। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল আমার প্রতি বেশ রেগে আছেন। কাজ করলে মানুষের মাথা গরম হয়ে থাকে। আম্মুর চেহারা তার জলন্ত উদাহরণ। আমি আম্মুর মুঠোফোনটা নিয়ে বাবাকে কল করে তারের জাল আনার কথাটা বলে দিলাম।
বিকেলে বাবা আসার সময় তারের জাল নিয়ে এলেন। এইট ফিট বাই সিক্স ফিট। আম্মু আমাকে আর বাবাকে বললেন যেন, এই জালটা বারান্দায় লাগিয়ে দিই। এর ফলে পাখি এসে বারান্দার রেলিং আর নোংরা করতে পারবে না। বাবা আর আমি আম্মুর কথামতো বারান্দায় জাল টা লাগিয়ে দিলাম। জালটা লাগানোর পর বারান্দাটাকে কেমন জানি কারাগার বলে মনে হচ্ছিল।
পরদিন বিকেলে বাবা আর আমি হাঁটতে বের হলাম। রামগড়ের রোডটা ধরে হাঁটছিলাম। রামগড় আমাদের পাশ্ববর্তী উপজেলা। কিন্তু এখান থেকে এর দূরত্বটা খুব বেশী নয়। আমাদের বাসাটা রামগড় উপজেলার নিকটে হলেও এর অবস্থান লক্ষ্মীছড়ি উপজেলায়।
-ক্রেডিট কার্ডটার মালিকের ব্যাপারে কোনো খোঁজ পাওয়া গিয়েছে?
-খোঁজাখোঁজির কাজ চলছে। ইদানীং অনেক কেইস এসে জমা হয়েছে। তাই এই বিষয়টা তেমন একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। তবে কাজ থেমে নেই।
-ওহ, আচ্ছা। বাবা জানো? প্রতিরাতে আমার বারান্দায় মানিব্যাগের সেই কালো শাড়ি পরা মহিলাটা আসে?
-কিহ? ঘিলুটা কি বাসায় রেখে এসেছিস নাকি?
-আরে হ্যাঁ। ঐ মানিব্যাগটা আমার কাছে থাকার পর থেকে আমি একটা শাড়ি পরা মহিলার ছায়া দেখি প্রতিরাতে।
-অন্যকিছুর ছায়াও তো হতে পারে, হয়তো এমন দেখাচ্ছে যেন সেটা একটা মহিলা।
-তাছাড়া ঐ ছবিটার উল্টো দিকে 'তিনটা তেত্রিশ' লিখা আছে।
-তাতে কি?
-প্রতিরাতে তিনটা তেত্রিশের সময় তোমার দেওয়া টেবিল ঘড়িটা অ্যালার্ম দেয় এবং ঐ সময়ই আমি ছায়াটা দেখি। মানিব্যাগটা আমার কাছে থাকার পর থেকেই প্রতিদিনই এমনটা হচ্ছে।
-মানিব্যাগটা তোর কাছে থাকার পর থেকেই যে এমনটা হচ্ছে সেটা কিভাবে নিশ্চিত হলি? পুরো ব্যাপারটা কাকতালীয়ও হতে পারে। হয়তো আজ রাতে এমনটা নাও ঘটতে পারে।
বাবার সাথে আর কথা না বাড়িয়ে হাঁটতে লাগলাম।
চলার পথে ব্রিটিশদের পুরনো গেস্ট হাউজটার কেয়ারটেকারের সাথে দেখা হলো
-কি হে! ডিউটিতে যাচ্ছো নাকি?
-না জনাব, আমি চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি।
-কেন? ঠিকমতো মাইনে পাও না নাকি?
-বয়স হয়েছে তো তাই।
-তাহলে নতুন কেয়ারটেকার এসেছে নাকি সেখানে।
-সে ব্যাপারে আমি জানিনা বাপু।
বাসায় ফিরে এলাম। আবারও উদ্দেশ্যহীনভাবে হিমেলের সেই বইটার ফাঁক থেকে মানিব্যাগটা নিয়ে দেখতে লাগলাম। সেই একই চিত্র। কালো শাড়ি পরিহিত মহিলার অস্পষ্ট ছবি এবং তার উল্টো পিঠে লিখা 'তিনটা তেত্রিশ'। পর্যবেক্ষণ শেষে আবার মানিব্যাগটা রেখে দিলাম। বুক শেলফের পাশের জানালাটা খুললাম। জানালাটা খুলতেই পাশের ডোবা থেকে প্রচুর দুর্গন্ধ রুমে প্রবেশ করা শুরু করল। গেস্ট হাউজটাতে কেউ একজন হাটছেন বলে মনে হচ্ছে। হয়তো নতুন কেয়ারটেকার এসেছে। অস্বস্তিকর দুর্গন্ধ থেকে বাঁচার জন্য জানালাটা আটকে দিলাম। কাল বায়োলজি ১ম পত্র পরীক্ষা। সাধারণত গ্রুপ সাবজেক্টগুলোর পরীক্ষা শেষের দিকে হয়। কিন্তু এবারের রুটিনে কলেজ কতৃপক্ষ কিছুটা ব্যাতিক্রম করেছে। টেবিলে বসলাম। বায়োলজি বইটা খুললাম। ঘড়িটা ঘুরছে না। গত রাতে এর ব্যাটারিটা খুলে রেখেছিলাম। সেটা এখনো লাগানো হয়নি। তিনটা ঊনচল্লিশ বরাবর আঁটকে আছে কাটাগুলো। দেওয়াল ঘড়িতে এখন আটটা বেজে দুই মিনিট। সেই অনুযায়ী টেবিল ঘড়িটাতে সঠিক সময় নির্ধারণ করলাম। রেখে দিলাম ঘড়িটা। টিক টিক টিক। বেশ কিছুক্ষণ পড়ার পর আম্মু খাবারের জন্য ডাক দিলেন। আজ বেশ খিদে লেগেছে। সবাই মিলে বসে খাবার খেয়ে নিলাম। খাবার খেলেই আমার ঘুম পায়। তাছাড়া পরীক্ষাটা এসে ঘুমের মধ্যে একটা বিশেষ মাত্রা যুক্ত করেছে। একটা ম্যাগাজিনে পড়েছিলাম মানুষ যদি টানা দশ দিন না ঘুমায় তাহলে সে মারা যায়। যদিও বিষয়টি সত্যি কিনা তা এক্সপেরিমেন্ট করে দেখার সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্য কোনোটিই আমার আজ পর্যন্ত হয়ে ওঠে নি। কারণ যে মানুষটা দশ ঘন্টা না ঘুমিয়ে থেকেই উন্মাদ হয়ে যায় সে এই এক্সপেরিমেন্ট করার যোগ্য নয়। তাছাড়া আমার তো মনে হচ্ছে যে বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে এই ক্ষণটা আরো লাঘব হবে। ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান ডিয়াগোতে ১৭ বছরের হাইস্কুল ছাত্র গার্ডেনার ১৯৬৪ সালে ২৬৪.৪ ঘন্টা (১১ দিন ২৪ মিনিট) না ঘুমিয়ে একটা বিশ্বরেকর্ড করেন। আমারও উচিৎ ছিল হাইস্কুলে থাকাকালীন সময়ে এই এক্সপেরিমেন্টটা করা৷ হাইস্কুলে থাকাকালীন সময়ে এক্সপেরিমেন্টটা করলে হয়তো সফল হতে পারতাম। কেননা সে সময়টাতে আরও বেশী ছোটাছুটির সুযোগ ছিল। আম্মু চাইলেও তখন আমাকে ঘুম পাড়াতে পারতো না। মাঝে মাঝে মন চায় টানা দশ-বারো দিন না ঘুমিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করে দেখি যে চির-নিদ্রায় নিমজ্জিত হওয়ার স্বাদ কেমন?
জাল লাগানোর পর বারান্দার প্রতি আকর্ষণবোধটা লাঘব হয়েছে। জেলখানার মতো মনে হচ্ছে। যদিও জেলখানায় জাল লাগানো থাকে না। সেখানে লোহার শিক লাগানো থাকে। সিনেমায় দেখেছি গরীব নায়ককে, নায়িকার ধনী বাবা পান থেকে চুন খসলেই চৌদ্দশিকে পুরে দেওয়ার হুমকি দেয়। আমার বাবা আইনের লোক হলেও কারাগার দেখার সুযোগ কখনো আমার হয় নি। তাই কারাগারে কি সত্যিই চৌদ্দটা শিক থাকে কি না, সেটা গননা করার সৌভাগ্যও আমার হয় নি। হয়তো যদি নিজে কখনো চৌদ্দশিকে আটক হই তখন গুনে দেখার সৌভাগ্য হবে। চৌদ্দ শিক গোনার জন্য হলেও একবার কারাবন্দী হওয়া উচিত৷ আজ একটু বেশীই রহস্যময় কথা মাথায় ঘুরছে৷ রহস্যময় কথা মাথায় ঘুরাটা বেশ উপভোগ্য। নিজেকে মনিষী বলে মনে হয়। বাইরের ল্যাম্পপোস্টটা তখনও জ্বলছিল। সূদুরে বন্দুকের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
রুমে এসে চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলাম। রুমের বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম। টেবিল ঘড়িটা তখনও টিক টিক টিক। আজ টেবিল ঘড়ির টিক টিক টিক শব্দটা একটুও বিরক্তিকর মনে হচ্ছে না। হঠাৎ কেন জানি টিক টিক আওয়াজটা শুনতে বেশ শ্রুতিমধুর লাগছিল। আওয়াজটা মনকে প্রশান্ত করে দিচ্ছে। চোখ লেগে আসছে। নিজেকে বেশ নিশ্চিন্ত মনে হচ্ছে। বেশ সুখ অনুভব করছি৷ আশা করি এ সুখ, আজ রাতের সুখনিদ্রা এনে দেবে। হঠাৎ মাথায় আসলো অতি সুখের ফলশ্রুতিতে আবার ভুতের কেলানি খেতে হবে না তো? কেননা আম্মু বলেছে, ''সুখে থাকলে, ভুতে কিলায়''।
সূর্যের এক চিলতে রোদ আমার মুখের উপর। সকাল হয়ে গেছে। সকাল সকাল হালকা শীতল আবহাওয়ায় এরকম রোদ বেশ আরামদায়ক। কাল রাতে কালো শাড়ি পরা মহিলাটি আসে নি। নাচও করে নি। বাবার কথাটাই সত্যি হলো। হয়তো তিনটা তেত্রিশে টেবিল ঘড়িটায় অ্যালার্মও বাজে নি। বেজে উঠলেও হয়তো আমার গভীর সুখতন্দ্রা ভেদ করে তা আমার কর্ণকুহরে পৌঁছাতে পারেনি।
টিক! টিক! টিক!

Next part pleaseeeeeee😥
ReplyDeleteI'm happy to hear that you're eager to read more. I'll do my best to keep the story engaging and deliver the next part soon.
DeleteWaiting for next part.......
ReplyDeleteNext part?
ReplyDeleteNext?
ReplyDelete