কালো রাত - পর্ব ০২(গল্প-সল্প)


বাসায় এসে ঢুকলাম। রুমে গিয়ে বাতি নিভিয়ে, পাখা চালিয়ে শুয়ে পড়লাম। কলিং বেলের আওয়াজ শুনতে পেলাম। আম্মু তখন রেফ্রিজারেটরের জিনিসপত্র নিয়ে ব্যস্ত। বাবা আসার সময় হয়েছে। দরজা খুলে দেখলাম বাবা এসেছে। 
–আজকে বটতলায় যাস নি?
-মাত্র আসলাম।
-সন্ধ্যাবেলায় প্রতিদিন বটতলায় গিয়ে সময় নষ্ট না করে, ঘরে বসে পড়তে পারিস না বুঝি?
বাবার কথার গুরুত্ব না দিয়ে দরজা আটকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
-কথা বলছিস না কেন?
রুমে চলে গেলাম। বাবাও চলে গেলেন ওয়াশরুমের দিকে।
ফ্রেশ হয়ে আসার পর আম্মু বাবাকে খাবার দিলেন। আমিও বসে পড়লাম। আম্মু আমাকেও খাবার দিলেন।
বাবা খাচ্ছিলেন আর একটু পর পর আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন। হঠাৎ করে বলে উঠলেন,
-পরশু দিন কি কলেজ আছে?
-হুম, কেন?
-পরশু দিন আমার ছুটি। ভাবছি নতুন একটা রেফ্রিজারেটর কিনব। তুই সাথে থাকলে ভালো হবে।
-এখন কেনার কি দরকার? কয়েকদিন পর তো আমরা এমনিতেই এখান থেকে চলে যাবো।
-সেটা অবশ্য ঠিক।
কথা বলতে বলতে আমার খাওয়া শেষ। হঠাৎ বাবার ফোন বেজে উঠল। ফোনটা বাবার রুমে ছিল। আমি হাত ধুয়ে ফোনটা ধরলাম। বাড়িওয়ালা আঙ্কেল কল করেছেন। অনেক বার হ্যালো, হ্যালো করেছি। কিন্তু কোনো সাড়া পেলাম না। কল ব্যাক করলাম। কিন্তু সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। বাবার রুমের খাটের নিচে অবহেলিতভাবে পড়ে থাকা রেডিওটার উপর নজর পড়ল। রেডিওটা বেশ পুরনো। ব্যাটারিচালিত রেডিও। ঠিকমতো সংযোগ আসে না সবসময়। বাড়িওয়ালা আঙ্কেল যেদিন এই বাসাটা ছেড়ে গিয়েছিলেন সেদিন তিনি এটি বাবাকে দিয়ে গেছেন। রেডিওর সুইচটা অন করলাম। ঠিকমতো চলছে না। আঁটকে আঁটকে আওয়াজ আসছে। রেডিওটি আওয়াজ করা একেবারে বন্ধ করে দিল। রেডিওটা অনেকদিন পড়ে থাকায় চার্জ নাও থাকতে পারে। তাই রেডিওটাকে চার্জে দিলাম এবং হাতে থাকা ফোনটা রেখে রুমে চলে গেলাম। পায়ের নিচে কিছু একটা লাগল। নিচে তাকিয়ে দেখলাম আধপোড়া সেই বইটা। অনেকগুলো পৃষ্ঠা পুড়ে গেছে। বইটা উঠিয়ে হাত দিয়ে মুছে বুক শেলফে রেখে দিলাম। হিমেলের কথা মনে পড়ে গেলো। হিমেল এই বইটা আমাকে আমার জন্মদিনে উপহার দিয়েছিল। বুক শেলফের পাশের জানালাটার দিকে নজর থামল। এই জানালাটা তেমন খুলি না। বেশিরভাগ সময় বন্ধ করে রাখি। জানালাটা আমাদের বাসার পিছন দিকে। বাসার পিছনের ডোবা থেকে প্রচুর দুর্গন্ধ আসে। ডোবাটা ব্রিটিশ আমলের। ডোবার ওপারে ব্রিটিশদের পুরনো একটা গেস্ট–হাউজ। কেউ সেটার তেমন যত্ন নেয় না। গেস্ট হাউজটা বেশ পুরনো বলে অনেক জায়গা দিয়ে দেওয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ে গেছে। অযত্নে আর অবহেলায় দিন দিন এটা বিলীন হওয়ার পথে। একজন কেয়ারটেকার আছেন। কিন্তু বেশিরভাগ রাতেই ফাঁকি দেন। গেস্ট হাউজটার ব্যাপারে অনেক বইয়ের মধ্যে পড়েছি। ব্রিটিশ আমলে এই গেস্ট হাউজে ডাকাত এবং মিলিটারি পুলিশদের মধ্যকার বন্দুকযুদ্ধে দুইজন পুলিশ ও চারজন ডাকাত মারা গিয়েছিলেন। এই গেস্ট হাউজটাতে এখনও ব্রিটিশদের অনেক মূল্যবান পুরাসামগ্রী আছে। তাই বাবা কেয়ারটেকারকে অনেকবার হুশিয়ারি দিয়েছেন, যেন তিনি রাতের বেলায় ফাঁকি না দেন। কিন্তু কেয়ারটেকার প্রতিবারই বাবাকে বলেন, তিনি নাকি এই গেস্ট হাউজটাতে রাতের বেলায় সেই ব্রিটিশ পুলিশ আর ডাকাতদেরকে দৌড়াদৌড়ি করতে দেখেন। বাবা ঠিক বুঝে ফেলেছেন যে, এগুলো সবই তার ফাঁকিবাজির তালবাহানা। বাবা অনেকবার তাকে অনুরোধও করেছিলেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা? তিনি এখনো নিয়মিত ফাঁকি দেন। জানালাটা বন্ধ করে রাখলাম। জানালাটা বন্ধ করলে ব্রিটিশদের ডোবা থেকে আমার রুমে আর দুর্গন্ধ আসে না। বিছানায় শুয়ে পড়লাম। চশমাটা খুলে মাথার পাশে রেখে দিলাম। বড্ড ঘুম আসছিল।

সকাল হয়ে গেছে। বাবা আস্তে আস্তে ডাকছেন। ঘুম ভাঙল। চোখ খুলে বাবাকে দেখলাম। অফিস যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।
-দরজাটা আটকে দে। আমি অফিস যাচ্ছি। 

বিরক্তি নিয়ে উঠলাম। দরজা আটকে বাবাকে বিদায় দিলাম। আম্মু তখনও ঘুম থেকে উঠেন নি। কাল রাত থেকে আম্মু শরীরে হালকা অসুস্থতা বোধ করছিলেন। তাই আর আম্মুকে ডাকিনি। ফ্রেশ হয়ে পড়তে বসলাম। কাল থেকে আমাদের নির্বাচনী পরীক্ষা শুরু। হঠাৎ দরজার নিচ দিয়ে ছায়ার মতো কিছু একটা দেখতে পেলাম। নিচে দরজার ফাঁক দিয়ে খবরের কাগজের কোণা দেখে বুঝতে পারলাম রোজকার মতো পত্রিকাওয়ালা এসে খবরের কাগজ দিয়ে গেছেন। আমি খবরের কাগজটা দরজার নিচ থেকে নিয়ে বারান্দার টি-টেবিলে রাখলাম। একটু পর আম্মু উঠলো। উঠে নাস্তা বানাতে লাগলো। একটু পর আমি কলেজে যাব। নাস্তা সেরে কলেজে চলে গেলাম।

তৌসিফ স্যার চল তড়িৎ এর অধ্যায়টা পড়াচ্ছেন। শর্ট সার্কিট নিয়ে আলাপ করছিলেন। আমার মনোযোগ নেই। স্যারের ক্লাস কেমন জানি বিরক্তিকর লাগে। যদিও স্যার খুব ভালো পড়াতে পারেন। আজ কলেজ বিরতির সময় ছুটি দিয়ে দিয়েছে। সম্ভবত কলেজের স্যারদের কোনো মিটিং আছে। বাসায় চলে আসলাম। আম্মু তখন রেফ্রিজারেটর থেকে খাসির মাংসগুলো বের করছিলেন। আমি ফ্রেশ হয়ে রুমে ঢুকছিলাম। আম্মুর ফোনের আওয়াজ শুনতে পেলাম। আম্মু ব্যস্ত থাকায় আমিই কল রিসিভ করতে এগিয়ে গেলাম। বাড়িওয়ালী আন্টি ফোন করেছেন।
-আসসালামু আলাইকুম, আন্টি।
-ওয়ালাইকুম সালাম।
-কেমন আছেন, আন্টি?
-ভালো নাই রে বাপ!
-আন্টি কি হয়েছে?
-তোর আঙ্কেল আর নাই রে......
-কেন, আন্টি আঙ্কেলের কি হয়েছে? 
-তোর আঙ্কেল দুপুর দেড়টার দিকে আমাকে একা রেখে আল্লাহর কাছে চলে গেছে।
-আঙ্কেলের কি হয়েছিল, আন্টি?
-গলায় ফাঁস দিয়েছেন.......

এটা বলে তিনি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। আমি শুনে আকাশ থেকে পড়লাম। আঙ্কেল খুবই আদর করতেন আমায়। আন্টির জন্য খুব খারাপ লাগছিল। মাত্র বছর খানেক আগে একমাত্র ছেলেটা আত্মহত্যা করলো। সেটার শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবার আঙ্কেলের আত্মহত্যা। আন্টি বড়ই অসহায় হয়ে গেছেন।
আম্মু পাশের রুম থেকে ডাক দিলো।
-কে কল করেছে?
আমি পাশের রুমে গেলাম।
-আম্মু, বাড়িওয়ালী আন্টি কল করেছেন।
-কি হয়েছে?
-আঙ্কেল গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
-ইন্না-লিল্লাহ।  কি বলিস এসব?
আম্মুর চোখ অশ্রুভেজা হয়ে উঠল। আঙ্কেলদের সাথে আমাদের সম্পর্কটা বেশ ভালো ছিল। আম্মু বলল,
-তোর আন্টির কথা ভেবে খুব খারাপ লাগছে।
-আমারও আম্মু।
-আমার উচিত এসময়ে তোর আন্টির পাশে থাকা। গ্রামের বাড়িতে তাদের আপন তেমন কেউ নেই। 
-ঠিক বলেছ আম্মু। তুমি কি যাবে আঙ্কেলদের গ্রামের বাড়িতে?
-হুম, যেতে তো হবেই। চল আমি আর তুই এক্ষুনি রওনা হই। কাল চলে আসব।
-কিন্তু আম্মু, আমার তো কাল থেকে নির্বাচনী পরীক্ষা শুরু।
-হুম.....। তাহলে আমিই চলে যাই। তোর বাবাও ডিউটির সময় যেতে পারবে না। তোর বাবা সন্ধ্যার দিকে চলে আসবে। রাতের খাবারটা গরম করে খেয়ে নিস। আমি খাসির মাংস রান্না করে রেখেছি। আমাকে যত দ্রুত সম্ভব সেখানে যেতে হবে।
-তাহলে, তাই করো। তুমি এক্ষুনি রওনা হও। আমাকে নিয়ে ভেবো না। বাবা তো সন্ধ্যায় চলে আসবেনই।
আঙ্কেলদের গ্রামের বাড়ি এখান থেকে খুব বেশী দূরে না। ট্যাক্সি করে যেতে পৌনে এক ঘন্টার মতো সময় লাগে। আম্মুকে বিদায় দিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসে পড়লাম। আর ভাবতে লাগলাম আঙ্কেল কেন আত্মহত্যা করলেন? মনে আরও অনেক প্রশ্ন বাসা বাঁধতে লাগলো। আমার চোখ পানিতে ভিজে গেলো। আঙ্কেল আমাকে অনেক আদর করতেন। বারবার আঙ্কেলের স্মৃতি ভেসে উঠছিলো। বারান্দার টি-টেবিলে সকালে ফেলে রাখা খবরের কাগজটার উপর নজর স্থির হলো। মন খারাপ ছিল বলে খবরের কাগজটা নিয়ে পড়তে লাগলাম৷ প্রথম পাতায় বেশ বড় করে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি নিয়ে প্রতিবেদন ছেপেছে। আরও জানতে পারলাম, ইদানীং খাগড়াছড়িসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একদল ডাকাতের উৎপাত বেড়েছে। নিচে ছোট করে ছেপেছে বিদ্যুতের অব্যবস্থাপনার প্রতিবেদন। দ্বিতীয় পাতা উল্টে দেখলাম। এককোনায় একটা প্রতিবেদনে নজর পড়লো। যেটার শিরোনাম ছিলো, বাংলাদেশে বেড়েছে আত্মহত্যার প্রবণতা। প্রতিবেদনটা পড়ে মন বেশ খারাপ হয়ে গেলো। হঠাৎ দেখলাম বটতলার নিচ দিয়ে বিকাশ কোচিং এ যাচ্ছে। আমাকে দেখে কান থেকে ইয়ারফোন খুলে হাত দিয়ে ইশারা করে বলল,
-ভাইয়া, কেমন আছেন?
-এইতো আছি কোনোরকম। তুমি কেমন আছো?
-হুম, ভাইয়া বেশ ভালো।
আবার কোচিং সেন্টারের দিকে হাটতে লাগলো। বটগাছটার দিকে তাকিয়ে মনে হালকা দুঃখ অনুভূত হচ্ছিল। বেশ বয়স হয়েছে বটগাছটার। অনেকগুলো পাতা শুকিয়েও গিয়েছে। তারপর আমি রুমে এসে শুয়ে পড়লাম। হিমেলের দেওয়া সেই বইটা পড়তে লাগলাম। পড়তে পড়তে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলো। মাগরিবের আযান দিলো। মোম জ্বালিয়ে ওযু করে, মাগরিবের নামায পড়ে নিলাম। মোনাজাতে আঙ্কেলের জন্য অনেক দোয়া করলাম। বাসায় প্রচন্ড গরম। লোডশেডিং চলাকালীন সময়ে মনে হয় গরমের তীব্রতা একটু বৃদ্ধি পেয়ে যায়। বটতলায় গিয়ে হাওয়া খেয়ে আসা দরকার। কিন্তু বাসায় তো কেউ নেই। বাবা আরও ঘন্টা খানেক পর আসবে। ভাবলাম সমস্যা নেই, বটতলা তো আমাদের বাসার ঠিক সামনেই। দরজার ছিটকিনিটা খুললাম। কিন্তু দরজা খুলছে না। জোরে জোরে টানতে লাগলাম। তবুও খুলছে না। বাইরের ছিটকিনিটা কেউ আটকে দিয়েছে। কিন্তু এই এলাকায় তেমন কেউ আসে না। তাহলে এটা কার কাজ হতে পারে? আমার পুরো শরীর ঘেমে যেতে লাগল। ইদানীং আমার সাথে অনেক ভৌতিক ঘটনা ঘটছে। ঘরে মোমবাতি ছাড়া তখন আর কিছুই জ্বলছিল না। এই এলাকাটা এতই নির্জন যে জানালা দিয়ে কারো কাছে সাহায্য চাওয়ারও সুযোগ নেই। আমি চিৎকার করলেও তা কেউ শুনবে না। আমি রুমে এসে চেয়ারে বসে ভাবতে লাগলাম দরজাটা বাহির থেকে কিভাবে আটকে গেলো। আমার কোনো ব্যক্তিগত মুঠোফোন নেই। তাই বাবাকেও কল করতে পারছি না। লোডশেডিং চলছে। তাই বাসার ল্যান্ডফোনটাও কাজ করছে না। আমার মনে হঠাৎ কেন যেন প্রচুর ভয়ের উদ্ভব হলো। ঘামে পুরো টি-শার্ট ভিজে গেছে আমার। আমি মোমবাতিটা নিয়ে টেবিলে রেখে, চেয়ারে বসে ফিজিক্স বইটা খুলে পড়তে লাগলাম। কাল ফিজিক্স পরীক্ষা। এবারের পরীক্ষার রুটিনটা একটু ব্যতিক্রম। পড়ায় মন বসছিল না। হঠাৎ মনে পড়লো বিকাশ তো একটু পরেই বটতলা দিয়ে যাবে। বারান্দায় গিয়ে বসে পড়লাম। বিকাশের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। ভাবলাম বিকাশ কে দেখলে বলবো, দরজাটা বাহির থেকে খুলে দিতে। কিন্তু অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরেও বিকাশকে দেখতে পেলাম না। বিকালে তো দেখলাম বিকাশ কোচিংয়ে যাচ্ছে। তাহলে এখন কেন বিকাশ আসছে না?
ভাবতে ভাবতে দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম পৌনে আটটা বাজে। বিকাশের যাওয়ার সময়টাও পেরিয়ে গেছে। সাড়ে সাতটায় বাবার চলে আসার কথা। কিন্তু বাবা এখনো আসছে না। আরও সময় পার হতে লাগল। মনে অস্থিরতা বাড়তে লাগল। সময় তখন রাত নয়টা। বাবা এখনো আসেন নি। আগে কখনো এমনটি হয় নি। বাইরেও যেতে পারছি না। সন্ধ্যা থেকেই বাহির থেকে দরজা আটকানো। খিদে লেগে গেলো। খাসির মাংস গরম করার জন্য পাতিল গ্যাসের চুলায় বসালাম। সুইচ ঘুরালাম। কিন্তু আগুন জ্বলছে না। বারবার চেষ্টা করেও কোনো লাভ হলো না। হয়তো গ্যাস ফুরিয়ে গেছে। মোমবাতিটাও প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। বিদ্যুৎ আসলো। মনে একটা প্রশান্তি খুঁজে পেলাম। বাতি জ্বালালাম। রাত তখন বারোটা বেজে গেছে। কাল পরীক্ষা। তাই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যেতে হবে। দরজার ছিটকিনিটা ভিতর থেকে খুলে দিলাম। যেন বাবা এসে বাহির থেকে ছিটকিনি খুলে ভেতরে ঢুকতে পারে। কাজটা আমার অনেকটা বাধ্য হয়েই করতে হয়েছে। হঠাৎ আমার রুমের বাতিটা অনবরত জ্বলতে নিভতে লাগলো। এমনটা অনেকক্ষণ যাবৎ চলতে থাকল। শেষ পর্যন্ত বাতিটাও ফিউজ হয়ে গেলো এবং আবারও বিদ্যুৎ চলে গেলো। আগে কখনো বিদ্যুতের এত সমস্যা হতে দেখিনি। তবে ইদানীং ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। অন্ধকার রুম থেকে বাইরে তাকালাম। বাইরে মেঘলা আকাশ। বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম। রোজকার মতো চশমাটা খুলে বালিশের পাশে রাখলাম। ঘুমিয়ে পড়লাম। বেশখানেক সময় পর হঠাৎ বজ্রপাতের শব্দে চোখ খুলে গেল। চোখ খোলার সাথে সাথেই দেখলাম আমার বুকের উপর অদ্ভুত আকৃতির কিছু একটা বসে আছে। দেখতে আজব রকমের। কান কাটা। একটা দাঁত আছে তার। চামড়া কুঁচকানো। বাম চোখে একটা কাঁটা চামচ ঢুকানো। পুরো মাথায় একটা চুলও নেই। ড্যাবড্যাব করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার বুক চেপে রেখেছে। আমি কথা বলতে পারছি না। এতো জোরে চেপে রেখেছে যে আমি নড়তেও পারছি না। নাকে অদ্ভুতরকম একটা দুর্গন্ধ অনুভব করছি। আস্তে আস্তে হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো লোকটা অদৃশ্য হয়ে গেলো। ডোবার পাশের জানালাটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম জানালাটা বন্ধ। তাহলে দুর্গন্ধটা কোথা থেকে আসছে। আমি মাথার পাশে রাখা চশমা খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু চশমাটা পেলাম না। তখনও লোডশেডিং চলছে। আকাশের বিদ্যুৎ চমকানোর আলোয় দেখতে পেলাম, দেয়াল ঘড়িতে তখন একটা বেজে তেরো মিনিট। আমি উঠে বসলাম। ভয়ে আমি, ঘামে ভিজে গেছি। টেবিলের উপর থেকে পানির বোতলটা নিয়ে পানি পান করলাম। চেয়ারের উপর বসলাম। আস্তে আস্তে বুঝতে পারলাম আমি স্লিপ প্যারালাইসিসড হয়েছি। স্লিপ প্যারালাইসিস নিয়ে হিমেলের দেওয়া সেই বইটায় পড়েছিলাম। বইটা থেকে জেনেছিলাম, স্লিপ প্যারালাইসিস একটি ইন্দ্রিয়ঘটিত ব্যাপার। স্লিপ প্যারালাইসিস হলে একেকজনের একেক রকম অনুভূতি হয়। কেউ ঘরের ভেতর ভৌতিক কিছুর উপস্থিতি টের পায়, কেউ দুর্গন্ধ পায়, কেউ বা আবার ভয়ানক কোনো প্রাণী দেখতে পায়। মোট কথা তখন হ্যালুসিনেশনের মতো একটা অবস্থার সৃষ্টি হয়। গভীর ঘুমের একটি পর্যায় থেকে আরেকটি পর্যায়ে যাওয়ার সময় মস্তিষ্ক সতর্ক হয়ে ঘুম ভেঙে গেলেও শরীর আসলে তখন ঘুমেই থাকে। ফলে অনুভূতিটা অন্যরকম থাকে। বিশেষ করে ইন্দ্রিয় তখন আচ্ছন্ন থাকায় মানুষ অদ্ভুত কিছু দেখে এবং শ্বাসকষ্ট অনুভব করে। আগে কখনো এই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হইনি। তাই আমি কি সত্যিই স্লিপ প্যারালাইসিস হয়েছি? নাকি ব্যাপারটা অন্যকিছু সেটা নিয়ে মনে সন্দেহ থেকেই গেলো। মনের সন্দেহ দূর করার জন্য গ্যাস লাইটার জ্বালিয়ে সমস্ত ঘরে হাঁটতে লাগলাম। বাবা এখনো বাসায় আসে নি। সমস্ত ঘরে হাটলাম। কিন্তু সেই লোকটাকে কোথাও দেখতে পেলাম না। চারিদিক তখন নিশ্চুপ। হঠাৎ কেউ একজন বলে উঠল, "এ.বি.সি. রেডিও, এইটি নাইন পয়েন্ট টু। আমি চমকে উঠলাম। বাবার রুমের রেডিওটা হঠাৎ বেজে উঠেছে। চার্জে লাগানোর আগে এর সুইচ অফ করতে ভুলে গিয়েছিলাম। রেডিওটা হাতে নিয়ে আমার রুমে এলাম। রেডিওটা অফ করে আমার পড়ার টেবিলের উপর রাখলাম। আমার চোখে চশমা নেই। তাই সবকিছু ঘোলাটে লাগছিল। আমি বারান্দায় গেলাম। সেখানেও কাউকে দেখতে পেলাম না। হঠাৎ নজর পড়ল বটগাছটার দিকে। বটগাছটার উপরের ডালে কিছু একটা জ্বলতে দেখলাম। আলোটা একবার জ্বলছিল, আবার নিভছিল। মনে হলো যেন কোনো উড়ন্ত আলো বটগাছের উপর মিটমিট করছে। আমি ভয়ে আমার রুমে চলে আসলাম। আমার সাথে কি হচ্ছে? আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। মনে সাহস জুগিয়ে তখনকার দুর্গন্ধের রহস্য উদঘাটনের জন্য ডোবার পাশের জানালাটার দিকে এগিয়ে গেলাম। জানালাটা খুললাম। জানালা খোলার সাথে সাথেই ডোবা থেকে দুর্গন্ধ আসা শুরু করল। কিন্তু তখন তো জানালা বন্ধ ছিল। ডোবাটার এদিক ওদিক ভালোভাবে দেখলাম। হঠাৎ ব্রিটিশদের গেস্ট হাউজে নজর পড়ল। সেখানে অল্প অল্প কিসের যেন আলো জ্বলছিল। ভালো মতো খেয়াল করে দেখলাম সেখানে কয়েকজন লোক দৌড়াদৌড়ি করছে। কিন্তু এত রাতে সেখানে কে দৌড়াদৌড়ি করবে? সেটাই মাথায় ঢুকছিল না। দেখে মনে হচ্ছ যেন, একদল ব্রিটিশ পুলিশ ডাকাতদের পেছনে দৌড়াচ্ছে। ঠিক যেমনটা এই গেস্ট হাউজটার কেয়ারটেকার বলেছিল। তারা গেস্ট হাউজটার দোতলার লম্বা বেলকনিতে দৌঁড়াচ্ছিল। আমি ভয়ে পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেলাম। বটগাছের মগডালে উড়ন্ত আলো এবং গেস্ট হাউজে এত রাতে কারো দৌড়াদৌড়ি করতে দেখার বিষয়টা আমার হজম হচ্ছিলো না। তবে কি সত্যিই ভূত আছে? আমি ঘুম থেকে উঠে যা দেখেছি তা কি আসলেই সত্যি? ব্যাপারগুলোকে গুলিয়ে ফেললাম। মেঝেতে লুটিয়ে পড়লাম। তারপর শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার !

বাইরে অনেক মানুষের কোলাহলে জ্ঞান ফিরল। চোখ খুললাম। তখন ভোর চারটা বাজে। এই নির্জন এলাকায় এতো মানুষ কোথা থেকে আসল। বাইরে কিসের যেন প্রচুর আলো। আমার পুরো রুম ধোঁয়ায় ভরে গেছে। তাড়াতাড়ি উঠে বারান্দায় চলে গেলাম। গিয়ে দেখলাম বটগাছে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। সেখানকার কয়েকজনকে ডাকও দিলাম। কিন্তু কারো আমার কথা শোনার সময় নেই। সবাই আগুন নেভাতে ব্যস্ত। ফায়ার সার্ভিসের একটা দলও কাজ করছে। অপরদিকে ধীরে ধীরে দিনের আলো ফুটছে। আগুন যখন মোটামোটি নিয়ন্ত্রণে তখন আবার আরেকজনকে ডাক দিলাম। তিনি সাড়া দিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
-কি হয়েছে?
-এই বটগাছের সাথে একটা বিদ্যুতের তার লেগে ছিল। সেটায় শর্ট সার্কিট হয়ে বটগাছের শুকনো পাতাগুলোতে আগুন লেগে গেছে। পাশে এলাকার মানুষ দূর থেকে আগুন-ধোঁয়া দেখে আমাদেরকে খবর দিয়েছে।
এই কথা বলেই তিনি আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আমি পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম। এজন্যই এলাকায় ইদানীং এতো লোডশেডিং হচ্ছে। সব কিছুর জন্য দায়ী বিদ্যুতের অব্যবস্থাপনা। কাল পত্রিকায় এ ব্যাপারে পড়েছিলাম। দেখতে দেখতে মোটামোটি সকাল হয়ে গেলো। চারিদিকে সূর্যের আলো। আমি চিন্তিত হয়ে পড়লাম। কেননা বাবা তখনো আসেন নি। সারারাত তিনি কোথায় ছিলেন, কোনো খোজখবর নিতে পারিনি। হঠাৎ দেখতে পেলাম। দরজার নিচ দিয়ে খবরের কাগজের কোণা বের হয়ে আছে। পত্রিকাওয়ালা এই মাত্র খবরের কাগজ দিয়ে গেছেন। আমি ভাবলাম, তিনি হয়তো দরজাটা বাইরে দিয়ে আটকানো দেখে খুলে দিয়েছেন। তাই দৌড়ে চলে গেলাম দরজার কাছে। ভেতর থেকে ছিটকিনি কাল রাতেই খুলে দিয়েছিলাম আমি। কিন্তু দূর্ভাগা আমি। তিনি হয়তো খেয়াল করেন নি। তাই বাইরের ছিটকিনি যে আটকানো, সেটাও নজরে আসেনি তার। আমি দরজার নিচ থেকে পত্রিকাটা নিলাম। পত্রিকাটা অবহেলিতভাবে টি-টেবিলে ফেলে রাখলাম। আমার পড়ার টেবিলের উপর রাখা রেডিওটা হাতে নিলাম। রেডিওর সুইচটা অন করলাম। ঠিকমতো সিগন্যাল আসছিল না। অস্পষ্টভাবে যেন বাবার নাম শুনতে পেলাম। আরে হ্যাঁ! এখানে তো বাবার ব্যাপারেই বলছে। রিপোর্টার বলে উঠলেন ''রাতের দুর্ধর্ষ অভিযানে খাগড়াছড়ির কুখ্যাত ডাকাতদলকে ব্রিটিশ গেস্ট হাউজে ডাকাতিকালীন আটক করলো গোয়েন্দা সংস্থা''। হঠাৎ দরজার ছিটকিনি খোলার আওয়াজ শুনতে পেলাম। বাইরে থেকে কেউ ছিটকিনিটা খুলেছে। আমি ভয়ে ভয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি বাবা এসেছে। আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম। এতো বড় বয়সে বাবাকে জড়িয়ে ধরে একটু লজ্জা অনুভব করলাম। বাবা বললেন,
-কিরে, কি হয়েছে তোর?
-কে যেনো দরজাটা বাহির থেকে আটকে দিয়েছে।
-ভয় পেয়েছিস?
-না, তেমন কিছু না।
-দরজাটা আমিই আটকেছিলাম।
-তুমি? কিন্তু কেন?
-কাল রাতে আমরা গোপন সূত্রে খবর পাই, খাগড়াছড়ির ভয়ঙ্কর ডাকাতদল আমাদের বাসার পেছনের গেস্ট হাউজটা লুট করার জন্য রামগড় থেকে এই এলাকায় আসছে। আমি আমার পুরো দল নিয়ে আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে নিলাম। হঠাৎ তোর কথা মনে পড়ল। কেননা তুই প্রতিদিন সন্ধ্যায় রামগড়ের রোডের পাশের বটতলায় আড্ডা দিস। তুই যদি সেই ডাকাতদলের সামনে পড়তি, তাহলে তারা তোর কোনো না কোনো ক্ষতি নিশ্চয়ই করতো। তাই আমি তৎক্ষনাৎ বাসায় এসে দরজা বাহির থেকে আটকে দিই। আমি তখন এতোটাই তাড়াহুড়োয় ছিলাম যে তোকে কিছুই বলে যেতে পারিনি। তারপর সারারাত অভিযান চালিয়ে মাঝরাতে আমরা তাদেরকে আটক করতে সক্ষম হই।

আমি এগুলো শুনে হা করে তাকিয়ে থাকলাম। বলার মতো তখন কিছুই ছিলো না। পুরো ব্যাপারটা অবশেষে আমার বোধগম্য হলো। কাল রাত আমার জন্য আজীবন একটা বিভীষিকাময় কালো রাত হয়ে থাকবে। এমন সময় হঠাৎ দরজায় কেউ যেন টোকা দিল।

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

কালো ডিম - পর্ব ০১ (গল্প-সল্প)

আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে আনার ১০১ টি উপায়

কালো শাড়ি - পর্ব ০৩(গল্প-সল্প)