নতুন শিক্ষা কারিকুলাম বনাম আপামর জনতা - ইফফাত হাছান অমি


বাংলাদেশের 'আপামর জনতা' কেন নতুন শিক্ষা কারিকুলাম মেনে নিতে পারছে না? 'আপামর জনতা'কে বিশেষায়িত করার বেশ বড় একটি কারণ রয়েছে। কেননা যারা গঠনমূলক সমালোচনা করতে পেরেছেন তারা আপামর জনতার কাতারে পড়েন না এবং তাদের গঠনমূলক মতামতকে আমি যথেষ্ট সন্মান করি বটে। তবে আপামর জনতার এই কারিকুলাম মেনে না নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি কারণ আমি ব্যক্তিগতভাবে আইডেন্টিফাই করার চেষ্টা করেছি। সাম্প্রতিক সময়ে আমার প্রত্যক্ষ করা কয়েকটি কারণ তুলে ধরছি।
১) বাঙালি শিক্ষার ফল হাতে হাতে পেতে চায়ঃ
বাঙালি জাতি হিসেবে সৌখিন নয়। বাঙালি শিক্ষার ফল হাতে হাতে পেতে চায়। বাঙালিরা চায় তাদের সন্তানেরা '১০০% কমন প্রশ্নব্যাংক', 'সিউর A+'  ট্যাগলাইনযুক্ত বই কিংবা ৫-৬ পৃষ্ঠার শিট পড়বে কিংবা ১০০ টা MCQ পড়ে ২৫ টা MCQ কমন পেয়ে পরীক্ষায় ফাটাফাটি রেজাল্ট করবে। এই যে তারা এই ধরনের শর্টকাট মেথডের সাথে এতদিন অভ্যস্ত হয়ে এসেছে এবং শর্টকাট মেথডগুলোর আউটপুট হাতে হাতে পেয়ে এসেছে, দীর্ঘদিনের এই প্র্যাক্টিসটিই তাদেরকে তাদের অজান্তে বর্তমান শিক্ষা কারিকুলামের বিপক্ষে লেলিয়ে দিয়েছে। প্রমথ চৌধুরী তাঁর 'বই পড়া' প্রবন্ধে বলেছেন-
শিক্ষার ফল হাতে হাতে পাওয়া যায় না, অর্থাৎ তার কোনো নগদ বাজার দর নেই। জ্ঞানের ভান্ডার যে ধনের ভান্ডার নয় এ সত্য তো প্রত্যক্ষ। শিক্ষকের সার্থকতা শিক্ষাদান করায় নয়, ছাত্রকে তা অর্জন করতে সক্ষম করায়। শিক্ষক ছাত্রকে শিক্ষার পথ দেখিয়ে দিতে পারেন, তার কৌতূহল উদ্রেক করতে পারেন, তার বুদ্ধিবৃত্তিকে জাগ্রত করতে পারেন, মনোরাজ্যের ঐশ্বর্যের সন্ধান দিতে পারেন, তার জ্ঞান পিপাসাকে জ্বলন্ত করতে পারেন, এর বেশি আর কিছু পারেন না।
হাস্যকর বিষয় হলো, যেসব গার্ডিয়ানদের দেখেছি সন্তানদের গলায় সারাবছর গাইড বই ঝুলিয়ে রেখেছিল কিংবা ৫-৬ পৃষ্ঠার শিট গিলে খাইয়েছিল তাদেরই বিরাট একটা অংশ এসেছে শিক্ষা কারিকুলামের ভুল ধরতে। কোমরে গামছা বেঁধে মানববন্ধনও করেছেন বেশ। খোঁজ নিলে দেখা যাবে এদের বৃহৎ একটা অংশই সমাজে 'পাশের বাসার আন্টি' নামে পরিচিত। সন্তানদের সামনে এভাবে নতুন কারিকুলামের সমালোচনা যে তাদের মধ্যে আগ্রহের পরিবর্তে অনীহার জন্ম দিচ্ছে, সেটাই এখন দুশ্চিন্তার বিষয়। নতুন শিক্ষা কারিকুলামের ব্যর্থতার প্রধান জায়গাটি হলো, এটি আপনাকে হাতে হাতে ফলাফল দিতে পারে না। এর জন্য আপনাকে সময় দিতে হবে। সহযোগিতা ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। এটি আপনার সন্তানের সার্বিক ডেভেলপমেন্ট এর উপর ভিত্তি করে নির্মিত। এটিকে যদি আপনি নেতিবাচক হিসেবে মনে করেন, তবে তা করতেই পারেন।
২) রাজনৈতিক রেষারেষিঃ
রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রেই তথাকথিত সমর্থকদের অন্ধ করে দিতে পারে। সেক্ষেত্রে নিরপেক্ষতার জায়গাটি অনেকসময় বজায় থাকে না। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে, তার পছন্দের রাজনৈতিক দলের কোনো উদ্যোগ নিয়ে বড়াই করতে না পারলেও, অপছন্দের দলটির যেকোনো উদ্যোগকে হেয় করাটাকে ওনারা এক প্রকার দায়িত্ব বলে ধরে নেন এবং এটিকে তারা বেশ উপভোগ করেনও বটে। আর সেই উদ্যোগটি যদি শিক্ষার মতো সেন্সিটিভ কোনো বিষয় নিয়ে হয়, তবে  তাদের কাছে পরিস্থিতিটি 'মেঘ না চাইতেই জল' এর মতো হয়ে দাঁড়ায়। যতদিন পর্যন্ত আমরা এই রাজনৈতিক রেষারেষির উর্ধ্বে গিয়ে নিরপেক্ষ জায়গা থেকে কোনো উদ্যোগকে বিচার-বিশ্লেষণ করতে না শিখব, ততদিন যেকোনো উদ্যোগই আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে না। তা আপনি যে দলেরই হোন না কেন। তাই একান্তে চোখ খুলে নিরপেক্ষ জায়গা থেকে দাঁড়িয়ে, অপরের মতের প্রতি সন্মান রেখে যেকোনো বিষয়কে বিচার করার চর্চা আমাদের গড়ে তোলা উচিৎ। তারপর সঠিক-ভুলের প্রশ্ন তোলা উচিৎ।
৩)'আমাদের আমলই ভালো ছিল' নামক তথাকথিত বড়াই দ্বারা বাঙালিরা প্রভাবিতঃ
'আমাদের আমলই ভালো ছিল' আমাদের বাপ-দাদাদের বিখ্যাত একটি বড়াই। যুগ যুগ ধরেই আমাদের বাপ-দাদারা এই বড়াই করে এসেছেন। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে ঠিক কোন আমলটি যে ভালো ছিল তা আইডেন্টিফাই করাটা বেশ মুশকিল। এই বড়াই যতদিন অক্ষুণ্ণ থাকবে ততদিন পর্যন্ত ইতিবাচক নতুন আমলের সূচনাকে বরণ করে নেওয়াটা বেশ কষ্টকর হবে। অথচ ওনাদের অধিকাংশরাই কারিকুলাম নিয়ে জাস্ট মানুষের মুখে মুখেই খবর পেয়েছেন। কারিকুলাম আসলেই কতটা ঢেলে সাজানো হয়েছে? নাকি হয়নি? এ বিষয়টি ওনারা নিজ থেকে কতটুকু জানার চেষ্টা করেছেন, সেটাই প্রশ্নবিদ্ধ। ওনারা ঠিকই বলেছেন। ওনাদের আমলই ভালো ছিলো। কেননা তখন ওনাদের বাপ-দাদাদের বড়াই ওনারা মুখ বুজে সহ্য করে নিতেন। বিচার-বিশ্লেষণ করে এতো মাথা ঘামানোর প্রয়োজন হতো না তখন। এই বড়াই আমাদের জাতিগত বড়াই। ওনাদের মতে, সেই বড়াইয়ের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে গিয়ে এরকম দু'একটা উদ্যোগকে যদি পদতলে পিষে ফেলতে হয়, তা এমন দোষের কি? জাতিগত বড়াই বলে কথা!
৪) কোচিং ব্যবসায়ীরা নিজেদের বানিজ্য ধরে রাখতে চায়ঃ
শিক্ষার এই সেক্টরটার সাথে বেশ বৃহৎ একটা অংশজুড়ে জড়িত আছেন কোচিং ব্যবসায়ীরা। সব কোচিং সেন্টারের কথা বলছি না। তাদের কথা বলছি, যারা ক্লাস টু-থ্রির বাচ্চাদের হাতে ৫-৬ পৃষ্ঠার '১০০% কমন' ট্যাগযুক্ত শিট তুলে দেন। নিজেদের এক্টিভিটি জাহির করতে আবার কত রকমের ঢং! 'ডেইলি শিট', 'উইকলি কুইজ', 'মান্থলি এক্সাম' আরও কত কি! ক্লাস টু-থ্রি'র দূর্বল বাচ্চাদের জন্য থাকে আবার স্পেশাল নোটবুক। শহরের অলি-গলিতে হাঁটলেই বোঝা যায়, এদেশে স্টুডেন্টের চেয়ে কোচিং সেন্টারের সংখ্যা বেশি। আগে তো তবুও ক্লাস টু-থ্রি কিংবা সিক্স-সেভেনের বাচ্চারা ওনাদের কোচিং-এ ভর্তি হতো স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষায় ফার্ট হওয়ার আশায়। এখন যখন ওনারা জানতে পারলেন মূল্যায়ন পদ্ধতি বদলাতে চলেছে, তখনই ওনাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। স্টুডেন্ট কমে যাবে ভেবে ওনারাও এখন স্টুডেন্ট-গার্ডিয়ানের কাছে এই কারিকুলাম নিয়ে সমালোচনা করেন। এখন আর গতানুগতিক মূল্যায়ন হয় না। এর পরিবর্তে হচ্ছে বছরব্যাপী ধারাবাহিক মূল্যায়ন। ধারাবাহিক মূল্যায়নের কারনে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে নিয়মিত ক্লাস করতে হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝে নিজেকে নিজে মূল্যায়নের বিষয়টি ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে। কোচিং ব্যবসায়ীদের সীমাবদ্ধতার জায়গাগুলো আসলে এখানেই। তাই এক্ষেত্রে ওনাদের বিরুদ্ধাচারণ করাটা বেশ স্বাভাবিকই বটে।
বর্তমান কারিকুলামকে 'আপামর জনতা' মেনে না নেওয়ার পেছনে আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। যেকোনো নতুন পদক্ষেপ কিংবা পরিবর্তনের ক্ষেত্রেই সমালোচনা কিংবা দ্বিমত পোষনের জায়গাটি থাকা বেশ স্বাভাবিক। তবে সেই সমালোচনাটি হওয়া উচিৎ  গঠনমূলক। কারিকুলাম নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করার অনেক জায়গা হয়তো আছে। থাকাটা হয়তো স্বাভাবিক। এটি বাস্তবায়নে প্রাথমিক পর্যায়ে হয়তো আমাদের অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে। আমরা সেই প্রতিবন্ধকতাগুলোকে কিভাবে কাটিয়ে তুলতে পারি সেটি নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা না করে, আমরা পড়ে আছি সমালোচনা নিয়ে। সমালোচনা বিষয়টিকে আমরা যতটা সস্তা বানিয়ে ফেলেছি, সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে গঠনমূলক সমালোচকদের অনেক কথাই হয়তো ঢাকা পড়ে গিয়েছে। আমি শিক্ষকতা পেশাটিকে যথেষ্ট সন্মান করি। আমার প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষাজীবনে বেশ কয়েকজন ভালো শিক্ষক পেয়েছি। যারা আমার কাছে আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। আমার বাবাও একজন মাধ্যমিক পর্যায়ের এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। সেই সুবাদে কারিকুলামের আগাগোড়া  সামনে থেকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছে। যখন গ্রামের বাড়ি গিয়েছি, বাবার প্রতিষ্ঠানে গিয়ে স্বচক্ষে দেখে এসেছি। নতুন কারিকুলামে সম্ভাবনাময় অনেক জায়গা আছে। তাই এত ব্যাপক সমালোচনা করে শিক্ষার্থীদের মাঝে অনীহা সৃষ্টি না করাটাই শ্রেয়। অপরের মতকে নিরপেক্ষ জায়গা থেকে সন্মান করুন। ধন্যবাদ।

Comments

Popular posts from this blog

কালো ডিম - পর্ব ০১ (গল্প-সল্প)

আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে আনার ১০১ টি উপায়

কালো শাড়ি - পর্ব ০৩(গল্প-সল্প)